উপমহাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী শ্রেয়া ঘোষাল তাঁর শেকড়ের টানে ২০১৯ সালের ২৮ মে শুক্রবার সকালে এসেছিলেন বাংলাদেশে। বাবা বিশ্বজিৎ ঘোষালকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ঘুরে দেখেন তাঁর পৈতৃক ভিটা, যা বাংলাদেশের বিক্রমপুরের শ্রীনগর থানার হাঁসাড়া বাজারের উত্তর পাশে বর্তমানে বাড়ৈখালী, ঢাকা সড়ক ঘেঁষে চোখে পড়ে।
ছোটবেলা থেকেই শ্রেয়া ঘোষাল শুনে এসেছেন, তাঁর দাদুবাড়ি ছিল বাংলাদেশের বিক্রমপুরে, হাঁসাড়া গ্রামে। মাটির গন্ধ, শেকড়ের টান আর পূর্বপুরুষদের স্মৃতি তাঁকে বারবার টেনেছে এই জন্মভিটার দিকে। এ প্রসঙ্গে শ্রেয়া ঘোষাল বলেন, "এখানেই আছে আমার শেকড়, আমার পূর্বপুরুষদের স্মৃতিময় পুরোনো বাড়ি আরও কত স্মৃতি।"
শ্রেয়া ঘোষালের দাদু সুধীরচন্দ্র ঘোষাল ১৯৪৭ সালের দেশভাগের আগেই কলকাতা চলে যান। তাঁর বাবার জন্ম সেখানেই। তবে বিক্রমপুরে এখনো তাঁদের অনেক আত্মীয়স্বজন আছেন। বাবা বিশ্বজিৎ ঘোষাল এর আগেও আত্মীয়দের বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন, তবে শ্রেয়া ঘোষাল এবারই প্রথম এলেন তাঁর পূর্বপুরুষের ভিটামাটিতে।
স্মৃতির সরণিতে ঘোষাল পরিবার
নিজের পুরোনো বাড়িতে প্রবেশ করার পর শ্রেয়া ঘোষাল দীর্ঘক্ষণ জানালার বাইরে চেয়ে থাকেন। চোখ ফিরিয়ে তিনি বলেন, "শেকড়ের টান বড় অদ্ভুত। এ কারণেই হয়তো বাংলাদেশের শ্রোতাদের সামনে গান গাইতে খুব ভালো লাগে।"
বিক্রমপুর ঘুরে ফিরে যাওয়ার সময় তিনি বলেন, "এখন তো বিক্রমপুর আমাদের খুব কাছের কেউ নেই। শুধু স্মৃতিটুকুই সম্বল। চারদিকের সবুজ প্রকৃতি দেখে আর মানুষের সঙ্গে কথা বলে আমার খুব ভালো লেগেছে। আর সবাইকে খুব বেশি আপন মনে হচ্ছে।"
দাদুর স্মৃতিময় বাড়িতে এখনো রয়েছে নারিকেল গাছ, যেখান থেকে তাঁদের ডাবের জল দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। স্থানীয় ষোলঘর মিষ্টির দোকানেও যাওয়া হয় এবং সেখানকার দারুণ মিষ্টির স্বাদ গ্রহণ করেন তাঁরা। বাবা বিশ্বজিৎ ঘোষাল তাঁকে পূর্বপুরুষের ভিটে দেখান। তিনি বলেন, "তেমন কিছুই নেই। কিন্তু তার পরও বেশ অনুভব করতে পারছিলাম। আমার জন্ম তো এখানেও হতে পারত।" দেশ ভাগ না হলে আজকের বিখ্যাত শ্রেয়া ঘোষালের ঠিকানা হয়তো হাঁসাড়া গ্রামই থাকতো। তাঁদের বাড়িটি এখন আগের মতোই রয়েছে এবং কেউ একজন বসবাস করছেন।
বাবার চোখে দেশভাগ ও স্মৃতি
শ্রেয়া ঘোষালের বাবা বিশ্বজিৎ ঘোষাল দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলেন, "দেশের টান আর রক্তের টান অনেক বড় টান। ১৯৪৭-এর দেশভাগের প্রবল যন্ত্রণায়, শেকড়ের টান আদি নিবাস জন্মভিটা বিক্রমপুরের মাটি ও বাতাস প্রতিটা মুহূর্তে আমাকে হাসায়, আর প্রবল যন্ত্রণায় কাঁদিয়েছে।"
বাড়ির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দমকা নিঃশ্বাস ছেড়ে তিনি দাদুর মুখে শোনা স্মৃতির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "আমাদের বাড়িটা অপূর্ব ছিল। বাড়ির সামনে বিশাল আমবাগান। বৈশাখী ঝড়ে আম কুড়ানোর কথা, দিঘিটায় সাঁতার কেটেছি দিঘির এপার-ওপার। পুকুরে থইথই পানি, ভরা মাছ। আমবাগানে অসংখ্য পাখির কলরব। শালিক, ডাহুক—নানান পাখির ডাকে মুখরিত বাড়িটির চারপাশ। বাড়িতে হাসনাহেনা, বেলি ফুল ডালপালা ছড়িয়ে বিশাল জায়গা দখল করে রাখত। রাতে ফুলের গন্ধে বাতাসে মৃদু মৃদু ভেসে আসতো—ফুলের গন্ধে মাতাল হাওয়া। প্রতিটা মুহূর্ত আমাকে দোলা দিয়ে যায়। কেন মাটি এত টানে? ধুলো পড়া স্মৃতির পাতা থেকে ধুলো সরাতেই যে যাই। মাটির ডাক তো উপেক্ষা করতে পারি না। আমার দাদুর কত স্মৃতি এই মাটিতেই ঘুমিয়ে আছেন। তা বলে শেষ করা যাবে না।"
বিদায়ের বেলায় ফিরে যাওয়ার সময় তিনি বলেন, বাংলাদেশকে তাঁর নিজের দেশ মনে হয়।
উপমহাদেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পী
বর্তমানে শ্রেয়া ঘোষাল এই উপমহাদেশের সংগীত ভুবনে এক দেদীপ্যমান নাম। তাঁর গান শুনে ভালো লাগেনি এমন মানুষ এই উপমহাদেশে কম। বাংলা ভাষা ছাড়াও তিনি হিন্দি, নেপালি, তামিল, ভোজপুরি, তেলুগু, ওড়িয়া, গুজরাতি, মালয়ালম, মারাঠি, কন্নড়, পাঞ্জাবি ও অসমীয়া ভাষায় গান গেয়ে নিজেকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
তিনি চারবার ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, চারবার কেরালা রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার, দুইবার তামিলনাড়ু রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার, সাতবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার ও দশবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার দক্ষিণ অর্জন করেছেন। তিনি পাঁচবার ফোর্বস জরীপে ভারতের শীর্ষ ১০০ তারকার তালিকায় স্থান করে নেন। ২০১৭ সালে প্রথম ভারতীয় সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে মাদাম তুসো জাদুঘরে শ্রেয়া ঘোষালের মোমের মূর্তি স্থাপিত হয়।
তাঁর গান, তাঁর প্রতিভা এবং এই শেকড়ের প্রতি তাঁর টান, সব মিলিয়ে বলা যায়, শ্রেয়া ঘোষালের ক্ষেত্রে "শ্রেয়" শব্দটিই বেছে নেওয়া শ্রেয়।
সূত্র: বিক্রমপুর পরগণা
শেকড়ের টানে বিক্রমপুরে সংগীত শিল্পী শ্রেয়া ঘোষাল
শেকড়ের টানে বিক্রমপুরে সংগীত শিল্পী শ্রেয়া ঘোষাল
উপমহাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী শ্রেয়া ঘোষাল তাঁর শেকড়ের টানে ২০১৯ সালের ২৮ মে শুক্রবার সকালে এসেছিলেন বাংলাদেশে। বাবা বিশ্বজিৎ ঘোষালকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ঘুরে দেখেন তাঁর পৈতৃক ভিটা, যা বাংলাদেশের বিক্রমপুরের শ্রীনগর থানার হাঁসাড়া বাজারের উত্তর পাশে বর্তমানে বাড়ৈখালী, ঢাকা সড়ক ঘেঁষে চোখে পড়ে। ছোটবেলা থেকেই শ্রেয়া ঘোষাল শুনে এসেছেন, তাঁর দাদুবাড়ি ছিল বাংলাদেশের বিক্রমপুরে, হাঁসাড়া গ্রামে। মাটির গন্ধ, শেকড়ের টান আর পূর্বপুরুষদের স্মৃতি তাঁকে বারবার টেনেছে এই জন্মভিটার দিকে। এ প্রসঙ্গে শ্রেয়া ঘোষাল বলেন, "এখানেই আছে আমার শেকড়, আমার পূর্বপুরুষদের স্মৃতিময় পুরোনো বাড়ি আরও কত স্মৃতি।" শ্রেয়া ঘোষালের দাদু সুধীরচন্দ্র ঘোষাল ১৯৪৭ সালের দেশভাগের আগেই কলকাতা চলে যান। তাঁর বাবার জন্ম সেখানেই। তবে বিক্রমপুরে এখনো তাঁদের অনেক আত্মীয়স্বজন আছেন। বাবা বিশ্বজিৎ ঘোষাল এর আগেও আত্মীয়দের বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন, তবে শ্রেয়া ঘোষাল এবারই প্রথম এলেন তাঁর পূর্বপুরুষের ভিটামাটিতে। স্মৃতির সরণিতে ঘোষাল পরিবারনিজের পুরোনো বাড়িতে প্রবেশ করার পর শ্রেয়া ঘোষাল দীর্ঘক্ষণ জানালার বাইরে চেয়ে থাকেন। চোখ ফিরিয়ে তিনি বলেন, "শেকড়ের টান বড় অদ্ভুত। এ কারণেই হয়তো বাংলাদেশের শ্রোতাদের সামনে গান গাইতে খুব ভালো লাগে।"বিক্রমপুর ঘুরে ফিরে যাওয়ার সময় তিনি বলেন, "এখন তো বিক্রমপুর আমাদের খুব কাছের কেউ নেই। শুধু স্মৃতিটুকুই সম্বল। চারদিকের সবুজ প্রকৃতি দেখে আর মানুষের সঙ্গে কথা বলে আমার খুব ভালো লেগেছে। আর সবাইকে
খুব বেশি আপন মনে হচ্ছে।" দাদুর স্মৃতিময় বাড়িতে এখনো রয়েছে নারিকেল গাছ, যেখান থেকে তাঁদের ডাবের জল দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। স্থানীয় ষোলঘর মিষ্টির দোকানেও যাওয়া হয় এবং সেখানকার দারুণ মিষ্টির স্বাদ গ্রহণ করেন তাঁরা। বাবা বিশ্বজিৎ ঘোষাল তাঁকে পূর্বপুরুষের ভিটে দেখান। তিনি বলেন, "তেমন কিছুই নেই। কিন্তু তার পরও বেশ অনুভব করতে পারছিলাম। আমার জন্ম তো এখানেও হতে পারত।" দেশ ভাগ না হলে আজকের বিখ্যাত শ্রেয়া ঘোষালের ঠিকানা হয়তো হাঁসাড়া গ্রামই থাকতো। তাঁদের বাড়িটি এখন আগের মতোই রয়েছে এবং কেউ একজন বসবাস করছেন। বাবার চোখে দেশভাগ ও স্মৃতিশ্রেয়া ঘোষালের বাবা বিশ্বজিৎ ঘোষাল দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলেন, "দেশের টান আর রক্তের টান অনেক বড় টান। ১৯৪৭-এর দেশভাগের প্রবল যন্ত্রণায়, শেকড়ের টান আদি নিবাস জন্মভিটা বিক্রমপুরের মাটি ও বাতাস প্রতিটা মুহূর্তে আমাকে হাসায়, আর প্রবল যন্ত্রণায় কাঁদিয়েছে।" বাড়ির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দমকা নিঃশ্বাস ছেড়ে তিনি দাদুর মুখে শোনা স্মৃতির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "আমাদের বাড়িটা অপূর্ব ছিল। বাড়ির সামনে বিশাল আমবাগান। বৈশাখী ঝড়ে আম কুড়ানোর কথা, দিঘিটায় সাঁতার কেটেছি দিঘির এপার-ওপার। পুকুরে থইথই পানি, ভরা মাছ। আমবাগানে অসংখ্য পাখির কলরব। শালিক, ডাহুক—নানান পাখির ডাকে মুখরিত বাড়িটির চারপাশ। বাড়িতে হাসনাহেনা, বেলি ফুল ডালপালা ছড়িয়ে বিশাল জায়গা দখল করে রাখত। রাতে ফুলের গন্ধে বাতাসে মৃদু মৃদু
ভেসে আসতো—ফুলের গন্ধে মাতাল হাওয়া। প্রতিটা মুহূর্ত আমাকে দোলা দিয়ে যায়। কেন মাটি এত টানে? ধুলো পড়া স্মৃতির পাতা থেকে ধুলো সরাতেই যে যাই। মাটির ডাক তো উপেক্ষা করতে পারি না। আমার দাদুর কত স্মৃতি এই মাটিতেই ঘুমিয়ে আছেন। তা বলে শেষ করা যাবে না।" বিদায়ের বেলায় ফিরে যাওয়ার সময় তিনি বলেন, বাংলাদেশকে তাঁর নিজের দেশ মনে হয়। উপমহাদেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পীবর্তমানে শ্রেয়া ঘোষাল এই উপমহাদেশের সংগীত ভুবনে এক দেদীপ্যমান নাম। তাঁর গান শুনে ভালো লাগেনি এমন মানুষ এই উপমহাদেশে কম। বাংলা ভাষা ছাড়াও তিনি হিন্দি, নেপালি, তামিল, ভোজপুরি, তেলুগু, ওড়িয়া, গুজরাতি, মালয়ালম, মারাঠি, কন্নড়, পাঞ্জাবি ও অসমীয়া ভাষায় গান গেয়ে নিজেকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।তিনি চারবার ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, চারবার কেরালা রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার, দুইবার তামিলনাড়ু রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার, সাতবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার ও দশবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার দক্ষিণ অর্জন করেছেন। তিনি পাঁচবার ফোর্বস জরীপে ভারতের শীর্ষ ১০০ তারকার তালিকায় স্থান করে নেন। ২০১৭ সালে প্রথম ভারতীয় সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে মাদাম তুসো জাদুঘরে শ্রেয়া ঘোষালের মোমের মূর্তি স্থাপিত হয়।তাঁর গান, তাঁর প্রতিভা এবং এই শেকড়ের প্রতি তাঁর টান, সব মিলিয়ে বলা যায়, শ্রেয়া ঘোষালের ক্ষেত্রে "শ্রেয়" শব্দটিই বেছে নেওয়া শ্রেয়। সূত্র: বিক্রমপুর পরগণা
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
১৫২/২, এ-২ গ্রীন রোড, রওশন টাওয়ার (লিফটের-৫),
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ । মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত