বাংলাদেশের চোখের স্বাস্থ্যসেবায় অপটোমেট্রি পেশাকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রশ্নটি এখন আর শুধু পেশাগত দাবি নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, গ্রামীণ সেবা এবং উৎপাদনশীলতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি নীতিগত ইস্যু। সম্প্রতি স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পপুলেশন রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিংয়ে (নিপোর্ট) এক আলোচনায় বলেন, দেশে অপটোমেট্রি পেশা এখনো যথাযথভাবে স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত বহু মানুষ, বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও বয়স্করা, শুধু একটি চশমার অভাবে স্বাভাবিকভাবে দেখতে পারছেন না। এই বক্তব্যটি বাংলাদেশের চোখের সেবার কাঠামোগত দুর্বলতাকে নতুন করে সামনে এনেছে।
বিশ্বজুড়ে অপটোমেট্রি মূলত প্রাথমিক চোখের স্বাস্থ্যসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিভিন্ন দেশের সরকারি ও পেশাগত উৎসে অপটোমেট্রিস্টদের চোখ ও দৃষ্টিসংক্রান্ত সমস্যার পরীক্ষা, রিফ্র্যাকশন, চশমা নির্ধারণ, প্রাথমিক ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজন হলে রেফারাল দেওয়ার ভূমিকাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, সিঙ্গাপুরের অপটোমেট্রি-সংক্রান্ত সরকারি তথ্য ও আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব অফথালমোলজির বর্ণনায় অপটোমেট্রিস্টদের প্রাথমিক ভিশন কেয়ার প্রদানকারী হিসেবে দেখানো হয়েছে, আর জটিল রোগ, চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের দায়িত্ব রাখা হয়েছে অফথালমোলজিস্টদের হাতে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই মডেলটি বিশেষভাবে জরুরি। কারণ, দেশের বড় অংশের জনগোষ্ঠী এখনো সহজলভ্য প্রাথমিক চোখের সেবা থেকে বঞ্চিত। The Business Standard-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রায় ৭০০ অপটোমেট্রিস্ট আছেন, যাদের বেশিরভাগই সংক্ষিপ্ত মেয়াদে প্রশিক্ষিত; একই সঙ্গে শিক্ষার সুযোগও সীমিত, আর অপটোমেট্রিস্টরা সরকারি স্বাস্থ্যকর্মী কাঠামোতে যথেষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত নন। এই ঘাটতি শুধু কর্মীসংকট নয়, বরং সেবা-অধিকারের ঘাটতিও। জনসংখ্যার তুলনায় এ সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল, ফলে রিফ্র্যাকটিভ এরর, প্রেসবায়োপিয়া, স্কুলচিলড্রেনের চশমার প্রয়োজন, কিংবা বয়স্কদের পড়ার সমস্যা, এসব সাধারণ কিন্তু ব্যাপক সমস্যার সমাধান ব্যাহত হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তিনি শুধু পেশাটির স্বীকৃতির কথা বলেননি, বরং এটিকে স্বাস্থ্যকর্মী কাঠামোর অংশ করার কথাও বলেছেন। তাঁর যুক্তি ছিল, অনেক সাধারণ চোখের সমস্যায় সব সময় চিকিৎসকের প্রয়োজন হয় না; প্রশিক্ষিত অপটোমেট্রিস্টরা তা সামলাতে পারেন। একই আলোচনায় তিনি শহর-গ্রামের মধ্যে স্বাস্থ্যকর্মী বণ্টনের বৈষম্য কমানোর তাগিদ দেন। এটি একটি বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি, কারণ প্রাথমিক স্ক্রিনিং, রিফ্র্যাকশন এবং রেফারাল ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করলে উচ্চতর স্তরের চক্ষু বিশেষজ্ঞরা জটিল রোগ ও অস্ত্রোপচারে বেশি সময় দিতে পারবেন।
অপটোমেট্রির শক্তি এখানেই যে এটি “সস্তা কিন্তু কার্যকর” হস্তক্ষেপ। টিবিএস-এর আরেক প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, পড়ার চশমা বা রিডিং গ্লাস অনেক কর্মক্ষম মানুষের উৎপাদনশীলতা ও আয় বাড়াতে পারে। প্রেসবায়োপিয়ায় আক্রান্ত শ্রমজীবী মানুষের ক্ষেত্রে সামান্য চশমাও কাজের গতি, সূক্ষ্ম কাজের সক্ষমতা এবং দৈনন্দিন জীবনমান বাড়ায়। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে কৃষি, পোশাকশিল্প, গৃহভিত্তিক কাজ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা বিস্তৃত, সেখানে একটি চশমার কার্যকারিতা অর্থনৈতিক দৃষ্টিতেও বড়। তাই অপটোমেট্রি কেবল চিকিৎসা নয়; এটি মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য হ্রাসেরও উপকরণ।
তবে স্বীকৃতি দিলেই কাজ শেষ নয়। গুণগত মান, পাঠ্যক্রম, ইন্টার্নশিপ, লাইসেন্সিং এবং কর্মপরিধি নির্ধারণ না করলে নতুন পেশাগত বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইনের আওতায় প্রজ্ঞাপন জারি হয়ে অপটোমেট্রি বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারী এবং এক বছর মেয়াদি ইন্টার্নশিপ সম্পন্নকারীদের ‘অপটোমেট্রিস্ট প্র্যাকটিশনার’ হিসেবে স্বীকৃতি ও নিবন্ধনের যোগ্যতা অনুমোদনের খবরটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে প্রশিক্ষণ খুব সীমিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে চালু আছে। অর্থাৎ আইনগত স্বীকৃতির পাশাপাশি প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ, মাননিয়ন্ত্রণ এবং কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করাই এখন পরবর্তী ধাপ।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে উপযোগী হবে একটি স্তরভিত্তিক চোখের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা। প্রাথমিক স্তরে অপটোমেট্রিস্টরা স্ক্রিনিং, রিফ্র্যাকশন, চশমা নির্ধারণ, সাধারণ চোখের সমস্যা শনাক্তকরণ এবং রোগীকে রেফারাল দিতে পারবেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরে অফথালমোলজিস্টরা জটিল রোগ, ওষুধ-নির্ভর চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার পরিচালনা করবেন। এই কাজের বিভাজন বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও দক্ষ করে। আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব অফথালমোলজি ও IAPB-এর নানা নথিতে প্রাথমিক চোখের সেবা, রেফারাল এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই মডেল গ্রহণ করলে অপচয় কমবে, অপেক্ষার সময় কমবে এবং রোগী সঠিক স্তরে দ্রুত পৌঁছাবে।
গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য এর প্রভাব আরও গভীর। গ্রামে চিকিৎসকের ঘাটতি, যাতায়াত ব্যয়, ওষুধ-নির্ভরতা এবং চক্ষু সেবা সম্পর্কে কম সচেতনতা মিলিয়ে দৃষ্টিজনিত সমস্যাগুলো অনেক সময় অচিহ্নিত থাকে। অপটোমেট্রিস্টদের উপজেলায়, স্কুলে, কমিউনিটি ক্লিনিকে এবং কর্মস্থলে নিয়োগ দেওয়া গেলে প্রাথমিক শনাক্তকরণ অনেক আগেই সম্ভব হবে। বিশেষ করে স্কুলচোখের স্বাস্থ্য, কিশোর-কিশোরীদের ভিশন স্ক্রিনিং, এবং বয়স্কদের প্রেসবায়োপিয়া ব্যবস্থাপনায় এটি বিপুল পরিবর্তন আনতে পারে। ফলত শিক্ষায় উন্নতি, কাজের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় অন্ধত্ব হ্রাস—সবই একই নীতির অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।
অতএব, অপটোমেট্রি পেশার বিস্তারকে শুধু একটি পেশাগত সুবিধা হিসেবে দেখা ভুল হবে। এটি স্বাস্থ্যখাতের বিকেন্দ্রীকরণ, ন্যায্যতা, এবং প্রাথমিক সেবার মানোন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত। এখন প্রয়োজন পরিষ্কার নীতিমালা, সরকারি পদ সৃষ্টি, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কোর্স সম্প্রসারণ, মানসম্মত ইন্টার্নশিপ, এবং হাসপাতালভিত্তিক রেফারাল চেইন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, অপটোমেট্রিস্ট ও অফথালমোলজিস্টের ভূমিকা প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, পরিপূরক—এই বোধটি প্রতিষ্ঠা করা। বাংলাদেশ যদি এই পথ ধরে এগোয়, তবে গ্রামাঞ্চলের মানুষ সত্যিই সুলভ, সময়োপযোগী এবং নিরাপদ চোখের সেবা পাবে।
ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান,
ভিশন সায়েন্টিস্ট ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জননীতি বিষয়ক বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নাল এবং গণমাধ্যম লেখক।
সহকারী অধ্যাপক ও গবেষণা ফেলো, ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি, মালয়েশিয়া
প্রধান উপদেষ্টা, বাংলাদেশ অপটোমেট্রিক সোসাইটি (BOS)
চোখের স্বাস্থ্যসেবায় সময়োপযোগী সংস্কারের দাবি
চোখের স্বাস্থ্যসেবায় সময়োপযোগী সংস্কারের দাবি
বাংলাদেশের চোখের স্বাস্থ্যসেবায় অপটোমেট্রি পেশাকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রশ্নটি এখন আর শুধু পেশাগত দাবি নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, গ্রামীণ সেবা এবং উৎপাদনশীলতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি নীতিগত ইস্যু। সম্প্রতি স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পপুলেশন রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিংয়ে (নিপোর্ট) এক আলোচনায় বলেন, দেশে অপটোমেট্রি পেশা এখনো যথাযথভাবে স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত বহু মানুষ, বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও বয়স্করা, শুধু একটি চশমার অভাবে স্বাভাবিকভাবে দেখতে পারছেন না। এই বক্তব্যটি বাংলাদেশের চোখের সেবার কাঠামোগত দুর্বলতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। বিশ্বজুড়ে অপটোমেট্রি মূলত প্রাথমিক চোখের স্বাস্থ্যসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিভিন্ন দেশের সরকারি ও পেশাগত উৎসে অপটোমেট্রিস্টদের চোখ ও দৃষ্টিসংক্রান্ত সমস্যার পরীক্ষা, রিফ্র্যাকশন, চশমা নির্ধারণ, প্রাথমিক ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজন হলে রেফারাল দেওয়ার ভূমিকাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, সিঙ্গাপুরের অপটোমেট্রি-সংক্রান্ত সরকারি তথ্য ও আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব অফথালমোলজির বর্ণনায় অপটোমেট্রিস্টদের প্রাথমিক ভিশন কেয়ার প্রদানকারী হিসেবে দেখানো হয়েছে, আর জটিল রোগ, চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের দায়িত্ব রাখা হয়েছে অফথালমোলজিস্টদের হাতে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই মডেলটি বিশেষভাবে জরুরি। কারণ, দেশের বড় অংশের জনগোষ্ঠী এখনো সহজলভ্য প্রাথমিক চোখের সেবা থেকে বঞ্চিত। The Business Standard-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রায় ৭০০ অপটোমেট্রিস্ট আছেন, যাদের বেশিরভাগই সংক্ষিপ্ত মেয়াদে প্রশিক্ষিত; একই সঙ্গে শিক্ষার সুযোগও সীমিত, আর অপটোমেট্রিস্টরা সরকারি স্বাস্থ্যকর্মী কাঠামোতে যথেষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত নন। এই ঘাটতি শুধু কর্মীসংকট নয়, বরং সেবা-অধিকারের ঘাটতিও। জনসংখ্যার তুলনায় এ সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল, ফলে রিফ্র্যাকটিভ এরর, প্রেসবায়োপিয়া, স্কুলচিলড্রেনের চশমার প্রয়োজন, কিংবা বয়স্কদের পড়ার সমস্যা, এসব সাধারণ কিন্তু ব্যাপক সমস্যার সমাধান ব্যাহত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তিনি শুধু পেশাটির স্বীকৃতির
কথা বলেননি, বরং এটিকে স্বাস্থ্যকর্মী কাঠামোর অংশ করার কথাও বলেছেন। তাঁর যুক্তি ছিল, অনেক সাধারণ চোখের সমস্যায় সব সময় চিকিৎসকের প্রয়োজন হয় না; প্রশিক্ষিত অপটোমেট্রিস্টরা তা সামলাতে পারেন। একই আলোচনায় তিনি শহর-গ্রামের মধ্যে স্বাস্থ্যকর্মী বণ্টনের বৈষম্য কমানোর তাগিদ দেন। এটি একটি বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি, কারণ প্রাথমিক স্ক্রিনিং, রিফ্র্যাকশন এবং রেফারাল ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করলে উচ্চতর স্তরের চক্ষু বিশেষজ্ঞরা জটিল রোগ ও অস্ত্রোপচারে বেশি সময় দিতে পারবেন। অপটোমেট্রির শক্তি এখানেই যে এটি “সস্তা কিন্তু কার্যকর” হস্তক্ষেপ। টিবিএস-এর আরেক প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, পড়ার চশমা বা রিডিং গ্লাস অনেক কর্মক্ষম মানুষের উৎপাদনশীলতা ও আয় বাড়াতে পারে। প্রেসবায়োপিয়ায় আক্রান্ত শ্রমজীবী মানুষের ক্ষেত্রে সামান্য চশমাও কাজের গতি, সূক্ষ্ম কাজের সক্ষমতা এবং দৈনন্দিন জীবনমান বাড়ায়। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে কৃষি, পোশাকশিল্প, গৃহভিত্তিক কাজ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা বিস্তৃত, সেখানে একটি চশমার কার্যকারিতা অর্থনৈতিক দৃষ্টিতেও বড়। তাই অপটোমেট্রি কেবল চিকিৎসা নয়; এটি মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য হ্রাসেরও উপকরণ। তবে স্বীকৃতি দিলেই কাজ শেষ নয়। গুণগত মান, পাঠ্যক্রম, ইন্টার্নশিপ, লাইসেন্সিং এবং কর্মপরিধি নির্ধারণ না করলে নতুন পেশাগত বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইনের আওতায় প্রজ্ঞাপন জারি হয়ে অপটোমেট্রি বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারী এবং এক বছর মেয়াদি ইন্টার্নশিপ সম্পন্নকারীদের ‘অপটোমেট্রিস্ট প্র্যাকটিশনার’ হিসেবে স্বীকৃতি ও নিবন্ধনের যোগ্যতা অনুমোদনের খবরটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে প্রশিক্ষণ খুব সীমিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে চালু আছে। অর্থাৎ আইনগত স্বীকৃতির পাশাপাশি প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ, মাননিয়ন্ত্রণ এবং কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করাই এখন পরবর্তী ধাপ। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে উপযোগী হবে একটি স্তরভিত্তিক চোখের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা। প্রাথমিক স্তরে অপটোমেট্রিস্টরা স্ক্রিনিং, রিফ্র্যাকশন, চশমা নির্ধারণ, সাধারণ চোখের সমস্যা শনাক্তকরণ এবং রোগীকে রেফারাল দিতে পারবেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরে
অফথালমোলজিস্টরা জটিল রোগ, ওষুধ-নির্ভর চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার পরিচালনা করবেন। এই কাজের বিভাজন বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও দক্ষ করে। আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব অফথালমোলজি ও IAPB-এর নানা নথিতে প্রাথমিক চোখের সেবা, রেফারাল এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই মডেল গ্রহণ করলে অপচয় কমবে, অপেক্ষার সময় কমবে এবং রোগী সঠিক স্তরে দ্রুত পৌঁছাবে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য এর প্রভাব আরও গভীর। গ্রামে চিকিৎসকের ঘাটতি, যাতায়াত ব্যয়, ওষুধ-নির্ভরতা এবং চক্ষু সেবা সম্পর্কে কম সচেতনতা মিলিয়ে দৃষ্টিজনিত সমস্যাগুলো অনেক সময় অচিহ্নিত থাকে। অপটোমেট্রিস্টদের উপজেলায়, স্কুলে, কমিউনিটি ক্লিনিকে এবং কর্মস্থলে নিয়োগ দেওয়া গেলে প্রাথমিক শনাক্তকরণ অনেক আগেই সম্ভব হবে। বিশেষ করে স্কুলচোখের স্বাস্থ্য, কিশোর-কিশোরীদের ভিশন স্ক্রিনিং, এবং বয়স্কদের প্রেসবায়োপিয়া ব্যবস্থাপনায় এটি বিপুল পরিবর্তন আনতে পারে। ফলত শিক্ষায় উন্নতি, কাজের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় অন্ধত্ব হ্রাস—সবই একই নীতির অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। অতএব, অপটোমেট্রি পেশার বিস্তারকে শুধু একটি পেশাগত সুবিধা হিসেবে দেখা ভুল হবে। এটি স্বাস্থ্যখাতের বিকেন্দ্রীকরণ, ন্যায্যতা, এবং প্রাথমিক সেবার মানোন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত। এখন প্রয়োজন পরিষ্কার নীতিমালা, সরকারি পদ সৃষ্টি, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কোর্স সম্প্রসারণ, মানসম্মত ইন্টার্নশিপ, এবং হাসপাতালভিত্তিক রেফারাল চেইন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, অপটোমেট্রিস্ট ও অফথালমোলজিস্টের ভূমিকা প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, পরিপূরক—এই বোধটি প্রতিষ্ঠা করা। বাংলাদেশ যদি এই পথ ধরে এগোয়, তবে গ্রামাঞ্চলের মানুষ সত্যিই সুলভ, সময়োপযোগী এবং নিরাপদ চোখের সেবা পাবে। ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, ভিশন সায়েন্টিস্ট ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জননীতি বিষয়ক বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নাল এবং গণমাধ্যম লেখক।সহকারী অধ্যাপক ও গবেষণা ফেলো, ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি, মালয়েশিয়াপ্রধান উপদেষ্টা, বাংলাদেশ অপটোমেট্রিক সোসাইটি (BOS)
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
১৫২/২, এ-২ গ্রীন রোড, রওশন টাওয়ার (লিফটের-৫),
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ । মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত