রবিবার, ২১ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
মতামত স্বাধীনতার ঘোষণাপাঠক এম. এ. হান্নান

স্বাধীনতার ঘোষণাপাঠক এম. এ. হান্নান

চট্টগ্রামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম মোহাম্মদ হাসান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে কিছু মানুষের অবদান এমনভাবে মিশে আছে যে তাঁদের ছাড়া ইতিহাসের বর্ণনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এম. এ. হান্নান তেমনই এক ব্যক্তিত্ব।

 জন্মসূত্রে তিনি চট্টগ্রামের সন্তান ছিলেন না, কিন্তু কর্ম, নেতৃত্ব, ত্যাগ এবং সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি চট্টগ্রামের মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছিলেন। চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাস, ছয় দফা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর সঙ্গে তাঁর নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে তিনি ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।

কিন্তু তাঁর পরিচয় কেবল স্বাধীনতার ঘোষণাপাঠকেই সীমাবদ্ধ নয়; তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সংগঠক, শ্রমিকনেতা, জননেতা এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অগ্রসৈনিক। পশ্চিমবঙ্গ থেকে চট্টগ্রাম এম. এ. হান্নান ১৯৩০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার তেহট্ট থানার খাসপুর গ্রামে এক শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মওলানা মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কর্মী এবং পরবর্তীকালে পাকিস্তান আন্দোলনের একজন সক্রিয় সংগঠক।

 দেশ বিভাগের পর পরিবারসহ পূর্ববাংলার মেহেরপুরে চলে আসেন তিনি। সেখানেই তাঁর শিক্ষা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকার জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হলেও পিতার মৃত্যুর কারণে আর্থিক সংকট নেমে আসে পরিবারে। বাধ্য হয়ে লেখাপড়া অসমাপ্ত রেখে চাকরিজীবনে প্রবেশ করতে হয় তাঁকে। তৎকালীন চার্টার্ড ব্যাংকে অফিস সহকারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও খুব দ্রুতই তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন।

 ভাষা আন্দোলনের সময় থেকেই তিনি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে চাকরির সুবাদে চট্টগ্রামে বদলি হয়ে আসেন এবং এখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এই শহরই পরবর্তীকালে হয়ে ওঠে তাঁর কর্ম ও সংগ্রামের প্রধান ক্ষেত্র। ছয় দফার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ষাটের দশকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ছয় দফা আন্দোলন যখন বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে, তখন চট্টগ্রামে এর অন্যতম দক্ষ প্রচারক ও ব্যাখ্যাকার হিসেবে আবির্ভূত হন এম. এ. হান্নান।

 ছয় দফার প্রতিটি বিষয় তিনি সাধারণ মানুষের ভাষায় এমনভাবে ব্যাখ্যা করতেন যে গ্রামের কৃষক, শ্রমিক কিংবা শহরের সাধারণ মানুষও সহজে এর তাৎপর্য বুঝতে পারতেন। ফলে চট্টগ্রামের বিভিন্ন সভা-সমাবেশে তাঁকে ছয় দফার বক্তা হিসেবে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানো হতো। তাঁর যুক্তিনির্ভর বক্তব্য, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং গণমানুষের সঙ্গে সহজ যোগাযোগের ক্ষমতা তাঁকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে। ধীরে ধীরে তিনি চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতায় পরিণত হন। শ্রমিক আন্দোলনের সাহসী নেতা রাজনীতির পাশাপাশি শ্রমিক আন্দোলনেও ছিল তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ।

চার্টার্ড ব্যাংকে কর্মরত অবস্থায় তিনি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে ১৯৫৯ সালে চাকরি হারান। পরে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে চাকরিতে পুনর্বহাল হলেও শেষ পর্যন্ত গণআন্দোলনের পথেই নিজেকে নিবেদিত করেন। ১৯৬২ সালে আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনের পর তিনি দলীয় কর্মকাণ্ডে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৬৬ সালে জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক এবং ১৯৬৮ সালে সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৬৯ সালে জাতীয় শ্রমিক লীগের প্রতিষ্ঠালগ্নে সিনিয়র সহ-সভাপতির দায়িত্ব লাভ করেন। চট্টগ্রামের নেতৃত্বে উত্থান সত্তরের দশকের শুরুতে চট্টগ্রামের রাজনীতিতে এম. এ. হান্নানের অবস্থান ক্রমেই দৃঢ় হতে থাকে। জননেতা এম. এ. আজিজের মৃত্যুর পর ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে তাঁকে চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তখন অনেকের কাছেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে ভবিষ্যৎ চট্টগ্রামের নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান মুখ হতে যাচ্ছেন এম. এ. হান্নান। তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং জনগণের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।

 সোয়াত জাহাজ অবরোধ : মুক্তিযুদ্ধের সূচনা পর্ব ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করা পাকিস্তানি জাহাজ ‘সোয়াত’ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ খালাস শুরু হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এম. এ. হান্নান বন্দরে ছুটে যান। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা দেখে তিনি শ্রমিক, ছাত্র ও জনতাকে সংগঠিত করেন। তাঁর আহ্বানে কয়েক হাজার মানুষ নিউমুরিং বন্দর ঘেরাও করে ফেলে। পরবর্তীতে ফায়ার ব্রিগেড ময়দানের জনসভা থেকে তিনি চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন সড়কে ব্যারিকেড গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুরো শহর প্রতিরোধের দুর্গে পরিণত হয়। পাকিস্তানি বাহিনী শেষ পর্যন্ত গুলি চালিয়ে বাধা অতিক্রম করলেও এই প্রতিরোধ ছিল মুক্তিযুদ্ধের পূর্বপ্রস্তুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। স্বাধীনতার ঘোষণাপাঠক ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরু হওয়ার পর চট্টগ্রামে প্রতিরোধ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২৬ মার্চ সকালে বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ ও পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

 সেই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন এম. এ. হান্নান। চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট ট্রান্সমিটার কেন্দ্র থেকে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত সেই ঘোষণা মুহূর্তেই মুক্তিকামী বাঙালির কাছে স্বাধীনতার বার্তা পৌঁছে দেয়। পরবর্তীতে ২৮ মার্চ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে পুনরায় স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারের ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ সময় তিনি মেজর জিয়াউর রহমান, আতাউর রহমান কায়সার, মীর্জা আবু মনসুরসহ চট্টগ্রামের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন। মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী জীবন মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এম. এ. হান্নান আগরতলায় যান এবং হরিণা যুবশিবির প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। স্বাধীনতার পরও তিনি শ্রমিক সংগঠন ও আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন।

 তিনি বাংলাদেশ রেল শ্রমিক লীগের সভাপতি, চট্টগ্রাম জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতি এবং বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সম্মেলনেও বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। অসময়ে প্রস্থান একজন সম্ভাবনাময় জাতীয় নেতার রাজনৈতিক জীবন দীর্ঘ হয়নি। ১৯৭৪ সালের ১১ জুন চৌদ্দগ্রামে এক সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন তিনি। পরদিন ফেনী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। মাত্র ৪৪ বছর বয়সে তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যু চট্টগ্রামসহ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে আনে।

ইতিহাসের অমর নায়ক বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এম. এ. হান্নানের নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে। তিনি ছিলেন স্বাধীনতার ঘোষণাপাঠক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, শ্রমিক আন্দোলনের সাহসী নেতা এবং চট্টগ্রামের গণমানুষের অকৃত্রিম বন্ধু। আজও চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং আওয়ামী লীগের সংগ্রামের ইতিহাসে তাঁর অবদান উজ্জ্বল হয়ে আছে। জন্মভূমি অন্যত্র হলেও কর্ম ও ত্যাগের মাধ্যমে তিনি চট্টগ্রামেরই মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও এম. এ. হান্নান আমাদের কাছে শুধু একটি নাম নয়; তিনি সাহস, নেতৃত্ব, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল প্রতীক।

খুঁজুন