ঢাকা বন বিভাগের বিভিন্ন বিটে সংরক্ষিত বনভূমি দখল, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, গাছ কাটা এবং উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে ঘুষ লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মের পেছনে ঢাকা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) বশিরুলসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।
অভিযোগ অনুযায়ী, চন্দ্রা, মৌচাক, রাথুরা, কাশিমপুর ও বাড়ইপাড়াসহ বিভিন্ন বন বিটে সরকারি জমি দখল করে ঘরবাড়ি, দোকান, গোডাউন ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। কোথাও উচ্ছেদ অভিযান চালানোর পর আবারও বনভূমি দখলের ঘটনা ঘটেছে। আবার কোথাও সংরক্ষিত বনের গাছ কেটে রাস্তা নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, বনভূমি রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
চন্দ্রা বিটে বনভূমি দখল ও স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, চন্দ্রা স্পিনিং মিল-সংলগ্ন ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে কারিগরপাড়ায় আশরাফ হোসেন ইটের দেয়াল তুলে চার কক্ষের একটি অর্ধপাকা ভবন নির্মাণ করছেন। চন্দ্রা টাওয়েল টেক্স-সংলগ্ন সংরক্ষিত বনভূমিতে আকাশমণি গাছ কেটে রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে তৌহিদুল ইসলাম সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে।
প্রাপ্ত তথ্যের দাবি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৩ মার্চ এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে। পরে জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি আবারও রাস্তার কাজ শুরু করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে মামলার বর্তমান অবস্থা এবং পুনরায় নির্মাণকাজ শুরুর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
কালিয়াকৈরের ভুলুয়া, কালামপুর, কুঁচপাড়া, বটতলা ও চান্দরা মৌজাতেও বনভূমিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ভুলুয়া এলাকায় শাকিল, কালামপুরে সামাদ, কুঁচপাড়ায় রনজিত, বটতলায় সাবেক ইসমাইল কমিশনারের ছেলে এবং চান্দরা মৌজায় রিমা নামের এক নারী বনভূমিতে বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করেছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অর্থ দেওয়া হয়েছে। কোথাও টিনশেড ঘর, কোথাও পাকা দোকান, আবার কোথাও একাধিক কক্ষবিশিষ্ট ভবন ও গোডাউন নির্মাণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ বিট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে
চন্দ্রা বিটের শিল্প কুঞ্জ পার্ক-সংলগ্ন এলাকায় মোতালেব ডাক্তার নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে পাকা দেয়াল তুলে দোকান নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এ জন্য বিট কর্মকর্তা ইকবাল হোসেনকে চার লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।
সকিনার মোড়ে জাকির নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে পাঁচ কক্ষের ঘর নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। এ কাজে ইকবাল, লুৎফর, মামুন ও লতিফ নামের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অর্থ দিয়ে ম্যানেজ করার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ ওঠার পর ঘরের একটি অংশ ভাঙা হলেও মূল স্থাপনা বহাল রয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
এ ছাড়া চান্দরা খেলার মাঠ এলাকায় পুড়ে যাওয়া একটি ঘর নতুন করে বহু কক্ষবিশিষ্ট স্থাপনায় রূপ দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বিরুদ্ধে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।
মাটিকাটা ইনক্রেটেবল ফ্যাক্টরি-সংলগ্ন এলাকায় সাবেদ ওরফে পীর সাহেব এবং ভুলুয়া মৌজায় আনোয়ার হোসেন ওরফে ব্ল্যাক আনোয়ারের বিরুদ্ধেও বনভূমিতে ইটের দেয়াল দিয়ে বাড়ি নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে।
মৌচাক বিটে নতুন দোকান ও কারখানার জমি দখলের অভিযোগ
মৌচাক বন বিটের ভান্নারা সাব-বিটের বনফুল বাজার এলাকায় নতুন করে ৩৪টি অবৈধ দোকান নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিটি দোকানের জন্য ৩০ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে।
আলিফ কম্পোজিট লিমিটেড নামের একটি কারখানার বিরুদ্ধে বনভূমি দখলের অভিযোগ রয়েছে। উচ্ছেদ ঠেকাতে বিট কর্মকর্তা শাজাহান মিয়ার মাধ্যমে তিন লাখ ৫০ হাজার টাকার লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অর্থ লেনদেনের স্বাধীন প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মাঝুখান মৌজায় আজিজুল ডাক্তার ও তাঁর ভাইয়ের বিরুদ্ধে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে গজারি ও আকাশমণি গাছ কাটার অভিযোগ উঠেছে।
রাথুরা বিটে গজারি গাছ কাটার অভিযোগ
শ্রীপুর রেঞ্জের রাথুরা বিটেও সংরক্ষিত বনভূমির গাছ কাটার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৪ জুন রাতে রাথুরা বিটের সিএস ১৩৬৯ ও ১৩৭১ দাগ থেকে ১০টি বড় গজারি গাছ কেটে মোজাম্মেল নামের এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয়। এ ঘটনায় বিট কর্মকর্তা শেখ ইমদাদ হোসেনের বিরুদ্ধে মাত্র আট হাজার টাকার বিনিময়ে গাছ বিক্রির অভিযোগ তোলা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ৩ নভেম্বর তাঁকে সিলেটে বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনি একই এলাকায় দায়িত্ব পালন করেছেন কি না, বদলির আদেশ কার্যকর হয়েছিল কি না এবং এ বিষয়ে কোনো প্রশাসনিক তদন্ত হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট নথি থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
রাথুরা বিটের বেলতলী ও কবরঘাটা এলাকাতেও বনের জমিতে ঘর নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব স্থাপনা নির্মাণে অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে বাধা এড়ানো হয়েছে।
কাশিমপুর ও রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জেও অনিয়মের অভিযোগ
কাশিমপুর বিটের মাধবপুর এলাকায় ইমরান নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিট কর্মকর্তা চান মিয়াকে ম্যানেজ করে দুই কক্ষের আধাপাকা ভবন নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জের নিশ্চিন্তপুরে আউলিয়ার টেক মাজারের সামনে বনভূমির গাছপালা কেটে পিচঢালাই রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কালীগঞ্জের এক প্রভাবশালী ঠিকাদারের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে এ কাজ করা হচ্ছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বন বিভাগ ও ঠিকাদারের বক্তব্য প্রয়োজন।
১৪ কোটি টাকার বনভূমি পুনর্দখলের অভিযোগ
মৌচাক বিটের ভান্নারা মৌজায় বনভূমি পুনর্দখলের অভিযোগটি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে অভিযান চালিয়ে প্রায় ১৪ কোটি টাকা মূল্যের জমির ৭০ শতাংশ উদ্ধার করা হয়েছিল। কিন্তু দুই বছরের মধ্যে কাঁটাতারের বেড়া ও খুঁটি কেটে সেখানে আবারও মার্কেট গড়ে তোলা হয়েছে।
বনপ্রহরী আমিনুল, জামাল ও মোবারকের সহযোগিতায় রাতের আঁধারে পুনর্দখল চলছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। সরকারি সার্ভেয়ার রনি হোসেন সরেজমিনে পরিমাপ করে জমি জবরদখলের প্রমাণ পেয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে পরিমাপসংক্রান্ত প্রতিবেদন, জমির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ এবং উদ্ধার করা জমির বর্তমান অবস্থা যাচাই করা জরুরি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত দুই মাসে সেখানে নতুন করে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়নি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিট কর্মকর্তা শাজাহান অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
বাড়ইপাড়ায় বনভূমি দখলের প্রতিযোগিতা
বাড়ইপাড়া বন বিটে প্রায় এক হাজার বিঘা জমি দখলের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে এসব জমিতে ঘরবাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে।
অভিযুক্ত শাহ আলম ক্যামেরার সামনে বনভূমিতে ঘর নির্মাণের জন্য বিট অফিসে ২০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন—এমন দাবি করা হয়েছে অভিযোগে। একইভাবে আশরাফ নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে চার কক্ষের পাকা বাড়ি নির্মাণ এবং বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করার কথা বলার অভিযোগ রয়েছে। এসব বক্তব্যের মূল ভিডিও ও পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট যাচাই করে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
ডিএফও বশিরুলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
বিভিন্ন বিটে অনিয়মের অভিযোগের পাশাপাশি ঢাকা বন বিভাগের ডিএফও বশিরুলের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, একাধিক অভিযোগ উত্থাপিত হলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এ ছাড়া সরকারি বন বিভাগের গেস্টহাউস ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগও তোলা হয়েছে। তবে গেস্টহাউস দখল, ব্যক্তিগত ব্যবহারে সরকারি সম্পদ কাজে লাগানো কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অন্য অভিযোগের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
বনভূমি দখল, গাছ কাটা, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ এবং ঘুষ লেনদেনের অভিযোগগুলো সত্য হলে তা সরকারি সম্পদ ও পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, জমির রেকর্ড ও উচ্ছেদসংক্রান্ত নথি যাচাই, অর্থ লেনদেনের প্রমাণ সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বন অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তাঁরা।
তবে অভিযোগের বিষয়ে ডিএফও বশিরুল, সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা, বিট কর্মকর্তা এবং নাম উল্লেখ করা অন্য ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা জরুরি। নিরপেক্ষ তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্টদের দায়মুক্তির বিষয়টিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ঢাকা বন বিভাগে দুর্নীতি ও বনভূমি দখলের অভিযোগ, তদন্তের দাবি
ঢাকা বন বিভাগে দুর্নীতি ও বনভূমি দখলের অভিযোগ, তদন্তের দাবি
ঢাকা বন বিভাগের বিভিন্ন বিটে সংরক্ষিত বনভূমি দখল, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, গাছ কাটা এবং উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে ঘুষ লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মের পেছনে ঢাকা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) বশিরুলসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগ অনুযায়ী, চন্দ্রা, মৌচাক, রাথুরা, কাশিমপুর ও বাড়ইপাড়াসহ বিভিন্ন বন বিটে সরকারি জমি দখল করে ঘরবাড়ি, দোকান, গোডাউন ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। কোথাও উচ্ছেদ অভিযান চালানোর পর আবারও বনভূমি দখলের ঘটনা ঘটেছে। আবার কোথাও সংরক্ষিত বনের গাছ কেটে রাস্তা নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বনভূমি রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। চন্দ্রা বিটে বনভূমি দখল ও স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ অভিযোগ রয়েছে, চন্দ্রা স্পিনিং মিল-সংলগ্ন ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে কারিগরপাড়ায় আশরাফ হোসেন ইটের দেয়াল তুলে চার কক্ষের একটি অর্ধপাকা ভবন নির্মাণ করছেন। চন্দ্রা টাওয়েল টেক্স-সংলগ্ন সংরক্ষিত বনভূমিতে আকাশমণি গাছ কেটে রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে তৌহিদুল ইসলাম সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে। প্রাপ্ত তথ্যের দাবি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৩ মার্চ এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে। পরে জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি আবারও রাস্তার কাজ শুরু করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে মামলার বর্তমান অবস্থা এবং পুনরায় নির্মাণকাজ শুরুর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন। কালিয়াকৈরের ভুলুয়া, কালামপুর, কুঁচপাড়া, বটতলা ও চান্দরা মৌজাতেও বনভূমিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ভুলুয়া এলাকায় শাকিল, কালামপুরে সামাদ, কুঁচপাড়ায় রনজিত, বটতলায় সাবেক ইসমাইল কমিশনারের ছেলে এবং চান্দরা মৌজায় রিমা নামের এক নারী বনভূমিতে বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অর্থ দেওয়া হয়েছে। কোথাও টিনশেড ঘর, কোথাও পাকা দোকান, আবার কোথাও একাধিক কক্ষবিশিষ্ট ভবন ও গোডাউন নির্মাণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ বিট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চন্দ্রা বিটের শিল্প কুঞ্জ পার্ক-সংলগ্ন এলাকায় মোতালেব ডাক্তার নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে পাকা দেয়াল তুলে দোকান নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এ জন্য বিট কর্মকর্তা ইকবাল হোসেনকে চার লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। সকিনার মোড়ে জাকির নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে পাঁচ কক্ষের ঘর নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। এ কাজে ইকবাল, লুৎফর, মামুন ও লতিফ নামের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অর্থ দিয়ে ম্যানেজ করার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ ওঠার পর ঘরের একটি অংশ ভাঙা হলেও মূল স্থাপনা বহাল রয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। এ ছাড়া চান্দরা খেলার মাঠ এলাকায় পুড়ে
যাওয়া একটি ঘর নতুন করে বহু কক্ষবিশিষ্ট স্থাপনায় রূপ দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বিরুদ্ধে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। মাটিকাটা ইনক্রেটেবল ফ্যাক্টরি-সংলগ্ন এলাকায় সাবেদ ওরফে পীর সাহেব এবং ভুলুয়া মৌজায় আনোয়ার হোসেন ওরফে ব্ল্যাক আনোয়ারের বিরুদ্ধেও বনভূমিতে ইটের দেয়াল দিয়ে বাড়ি নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। মৌচাক বিটে নতুন দোকান ও কারখানার জমি দখলের অভিযোগ মৌচাক বন বিটের ভান্নারা সাব-বিটের বনফুল বাজার এলাকায় নতুন করে ৩৪টি অবৈধ দোকান নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিটি দোকানের জন্য ৩০ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে। আলিফ কম্পোজিট লিমিটেড নামের একটি কারখানার বিরুদ্ধে বনভূমি দখলের অভিযোগ রয়েছে। উচ্ছেদ ঠেকাতে বিট কর্মকর্তা শাজাহান মিয়ার মাধ্যমে তিন লাখ ৫০ হাজার টাকার লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অর্থ লেনদেনের স্বাধীন প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মাঝুখান মৌজায় আজিজুল ডাক্তার ও তাঁর ভাইয়ের বিরুদ্ধে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে গজারি ও আকাশমণি গাছ কাটার অভিযোগ উঠেছে। রাথুরা বিটে গজারি গাছ কাটার অভিযোগ শ্রীপুর রেঞ্জের রাথুরা বিটেও সংরক্ষিত বনভূমির গাছ কাটার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৪ জুন রাতে রাথুরা বিটের সিএস ১৩৬৯ ও ১৩৭১ দাগ থেকে ১০টি বড় গজারি গাছ কেটে মোজাম্মেল নামের এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয়। এ ঘটনায় বিট কর্মকর্তা শেখ ইমদাদ হোসেনের বিরুদ্ধে মাত্র আট হাজার টাকার বিনিময়ে গাছ বিক্রির অভিযোগ তোলা হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৫ সালের ৩ নভেম্বর তাঁকে সিলেটে বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনি একই এলাকায় দায়িত্ব পালন করেছেন কি না, বদলির আদেশ কার্যকর হয়েছিল কি না এবং এ বিষয়ে কোনো প্রশাসনিক তদন্ত হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট নথি থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। রাথুরা বিটের বেলতলী ও কবরঘাটা এলাকাতেও বনের জমিতে ঘর নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব স্থাপনা নির্মাণে অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে বাধা এড়ানো হয়েছে। কাশিমপুর ও রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জেও অনিয়মের অভিযোগ কাশিমপুর বিটের মাধবপুর এলাকায় ইমরান নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিট কর্মকর্তা চান মিয়াকে ম্যানেজ করে দুই কক্ষের আধাপাকা ভবন নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জের নিশ্চিন্তপুরে আউলিয়ার টেক মাজারের সামনে বনভূমির গাছপালা কেটে পিচঢালাই রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কালীগঞ্জের এক প্রভাবশালী ঠিকাদারের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে এ কাজ করা হচ্ছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বন বিভাগ ও ঠিকাদারের বক্তব্য প্রয়োজন। ১৪ কোটি টাকার বনভূমি পুনর্দখলের অভিযোগ মৌচাক বিটের ভান্নারা মৌজায় বনভূমি পুনর্দখলের অভিযোগটি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে অভিযান চালিয়ে প্রায় ১৪ কোটি টাকা মূল্যের জমির ৭০ শতাংশ উদ্ধার
করা হয়েছিল। কিন্তু দুই বছরের মধ্যে কাঁটাতারের বেড়া ও খুঁটি কেটে সেখানে আবারও মার্কেট গড়ে তোলা হয়েছে। বনপ্রহরী আমিনুল, জামাল ও মোবারকের সহযোগিতায় রাতের আঁধারে পুনর্দখল চলছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। সরকারি সার্ভেয়ার রনি হোসেন সরেজমিনে পরিমাপ করে জমি জবরদখলের প্রমাণ পেয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে পরিমাপসংক্রান্ত প্রতিবেদন, জমির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ এবং উদ্ধার করা জমির বর্তমান অবস্থা যাচাই করা জরুরি। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত দুই মাসে সেখানে নতুন করে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়নি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিট কর্মকর্তা শাজাহান অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। বাড়ইপাড়ায় বনভূমি দখলের প্রতিযোগিতা বাড়ইপাড়া বন বিটে প্রায় এক হাজার বিঘা জমি দখলের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে এসব জমিতে ঘরবাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। অভিযুক্ত শাহ আলম ক্যামেরার সামনে বনভূমিতে ঘর নির্মাণের জন্য বিট অফিসে ২০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন—এমন দাবি করা হয়েছে অভিযোগে। একইভাবে আশরাফ নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে চার কক্ষের পাকা বাড়ি নির্মাণ এবং বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করার কথা বলার অভিযোগ রয়েছে। এসব বক্তব্যের মূল ভিডিও ও পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট যাচাই করে প্রকাশ করা প্রয়োজন। ডিএফও বশিরুলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন বিভিন্ন বিটে অনিয়মের অভিযোগের পাশাপাশি ঢাকা বন বিভাগের ডিএফও বশিরুলের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, একাধিক অভিযোগ উত্থাপিত হলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ ছাড়া সরকারি বন বিভাগের গেস্টহাউস ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগও তোলা হয়েছে। তবে গেস্টহাউস দখল, ব্যক্তিগত ব্যবহারে সরকারি সম্পদ কাজে লাগানো কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অন্য অভিযোগের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন। নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি বনভূমি দখল, গাছ কাটা, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ এবং ঘুষ লেনদেনের অভিযোগগুলো সত্য হলে তা সরকারি সম্পদ ও পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, জমির রেকর্ড ও উচ্ছেদসংক্রান্ত নথি যাচাই, অর্থ লেনদেনের প্রমাণ সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বন অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তাঁরা। তবে অভিযোগের বিষয়ে ডিএফও বশিরুল, সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা, বিট কর্মকর্তা এবং নাম উল্লেখ করা অন্য ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা জরুরি। নিরপেক্ষ তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্টদের দায়মুক্তির বিষয়টিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
রওশন টাওয়ার, (লিফট-৮) ১৫২/২/এ২ গ্রীণ রোড ,
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ ।
মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত