সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
মতামত সৌদি আরব বাংলাদেশিদের জন্য যেন এক গজবের দেশ!

সৌদি আরব বাংলাদেশিদের জন্য যেন এক গজবের দেশ!

কাজী আসমা আজমিরী :

সৌদি আরব সম্পর্কে বলতে গেলে, কিছুদিন আগে আমি যখন মালাবিতে ছিলাম, তখন এক ইউটিউবারের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। সে বাংলাদেশে আসছে। কথা হচ্ছিল, কোন দেশ সবচেয়ে পচা। তখন ওর গার্লফ্রেন্ড লাফিয়ে উঠে বলে, “সৌদি আরব।” তো আমি বললাম, “হ্যাঁ, আমারও মনে হয়েছে।” এবং আমি বিদেশের একটা ইন্টারভিউতে বলছিলাম, আমার কাছে সবচেয়ে খারাপ কোন দেশটা লেগেছে। তখন আমি বলেছিলাম, আমার কাছে সৌদি আরব খারাপ লেগেছে।

এই কথা বলেছি, কিন্তু বাংলাদেশের কোনো টিভিতে নয়। বাংলাদেশে কাউকে বলার সাহস একবার হয়েছিল। একটা ফ্রেন্ড ছিল, সে ডাক্তার। তাকে আমি বললাম, সৌদি আরব পৃথিবীর সবচেয়ে বাজে দেশগুলোর একটা। তো এটা বলার পর এবং বাংলাদেশি মেয়েদের জন্য সবচেয়ে অনিরাপদ যদি কোনো দেশ থাকে, সেটা সৌদি আরব এবং দুবাই, মানে সৌদি আরব, আবুধাবি, অর্থাৎ এমিরেটস। এই দুটি দেশ আমার মনে হয়েছে, বাংলাদেশি মেয়েদের জন্য সবচেয়ে অনিরাপদ। সবচেয়ে অনিরাপদ দেশ।

তো এটা বলার সঙ্গে সঙ্গে সে বলছে, “হ্যাঁ, আমার বান্ধবীরা গিয়েছে। তারা রাত তিনটার সময় নামাজ পড়ে আসে। তাদের কাছে সৌদি আরব অনেক ভালো।” তো সৌদি আরব মানে এটা নয় যে শুধু মক্কা আর মদিনা। সৌদি আরব বিশাল বড় একটা দেশ। এর বিভিন্ন অংশ আছে, বিভিন্ন জায়গা আছে।

তো সৌদি আরব সম্পর্কে আমি প্রথমেই শুরু করি। আমার সৌদি আরবে প্রথম যাওয়া হয় ২০২২ সালে। আমি জর্ডানের বর্ডার থেকে সৌদি আরবে যাওয়ার চেষ্টা করি। তখন আমার মনে আছে, বাংলাদেশ ট্রাভেলার গ্রুপের রাকিব ভাইয়েরা কাতার ওয়ার্ল্ড কাপে এসেছিলেন। তো উনি আমাকে বারবার ফোন করছেন, “আসেন।” তো আমি সৌদি আরবে আসব। কীভাবে জর্ডান থেকে সৌদি আরবের কোনো পথে আসব, সেটা খুঁজছিলাম।

আমি প্রথমে আকাবা শহর থেকে গেলাম। আকাবা থেকে তাবুক হয়ে আসার সুযোগ থাকে। কিন্তু ওখানে সম্ভব হলো না। ওখানে কোনো বাস ছিল না। আর আমি বাংলাদেশি বলে তাদের শেয়ার ট্যাক্সিতে যাওয়ার অনুমতি পাইনি। তারপর আবার আমাকে আকাবা থেকে আম্মানে আসতে হলো।

আম্মান থেকে আমি বাস নিলাম। অনেক খোঁজাখুঁজির পর আম্মান থেকে সরাসরি বাস পেলাম, যেটা রিয়াদ পর্যন্ত যায়। তো আমি এত দূর পর্যন্ত যেতে চাইনি। আমার তাবুক কিংবা আল-মুজায়িকের মতো কোনো একটা জায়গায় গেলে সবচেয়ে সহজ হতো। মানে আমি বেশি বাসযাত্রা করতে পছন্দ করি না। বিশেষ করে ছয় ঘণ্টার বেশি তো নয়ই। তারপরও মাঝে মাঝে আমাকে করতে হয়।

এই বাসে আম্মান থেকে সৌদি আরবের রিয়াদে যেতে মোটামুটি ১৮ ঘণ্টা লাগবে, ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা। আরও বেশি লাগতে পারে। তো আমার যাওয়ার ইচ্ছাই ছিল না। কিন্তু আর কোনো উপায় না পেয়ে শেষ পর্যন্ত উঠলাম।

এটা ছিল বিশ্বকাপের সময়। কাতার বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার মাত্র দুই-তিন দিন হয়েছে বলে মনে হয়। আমার মনে হয়, ২২ বা ২৩ তারিখে, নভেম্বর মাসে, আমি আম্মান থেকে রওনা দিয়েছিলাম।

যাওয়ার পরে আমি যখন জর্ডান ও সৌদি আরবের বর্ডারে নামলাম, তখন আমরা মাত্র চারজন যাত্রী ছিলাম। নামার পরে আমার জীবনের সবচেয়ে কুৎসিত অভিজ্ঞতাগুলোর একটি হয়েছিল সৌদিতে। আমার কাছে যদি কোনো দেশ বা দেশের মানুষকে খুব বিশ্রী লাগে, তাহলে সৌদির বসদের আমার খুবই বিরক্তিকর লাগে।

যাই হোক, আমি নামলাম। নামার পরে সবকিছু খুব ভালোভাবেই চলছিল। একজন তরুণ ইমিগ্রেশন অফিসার ছিলেন। তিনি আমাকে স্ট্যাম্প করে দিয়েছেন। তারপরে জর্ডানের ভিসা এবং আমার আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের ভিসা দেখে আমাকে ঢোকার অনুমতি দিলেন।

তারপরে বাস ও ব্যাগ চেক করার ব্যাপার ছিল। প্রথমে বাস পুরোটা চেক করলেন। তারপর ব্যাগ চেক করার সময় আমাকে খুব হয়রানি করা হয়। আমার কিছু অস্ট্রেলিয়ান কসমেটিকস ছিল, যেগুলোতে অ্যালকোহল ছিল। ওদের সিস্টেমে সেগুলো অ্যালকোহল হিসেবে ধরা হয়। তো এটা নিয়ে আমাকে জরিমানা করে। আমার দুটি বোতল ছিল, প্রতিটি ৩০০ ডলার করে, মোট ৬০০ ডলার।

আমি যখন জরিমানা করে, তখন ইমিগ্রেশন সিকিউরিটিকে অনুরোধ করি, আমাকে যেন তাদের বসের কাছে নিয়ে যায় এবং জরিমানাটা একটু কমিয়ে দেয়। আমি ২০০ ডলার দিতে চাই। এরপর তারা আমাকে একজন বাংলাদেশি হিসেবে খুব হয়রানি করে।

আর ওখানে সবচেয়ে বিরক্তিকর ব্যাপার ছিল, একজন বাংলাদেশিকে ডেকে নিয়ে আসে অনুবাদ করার জন্য। কিন্তু আমি যা বলি, তার উল্টোটা সে বলে। আমি বলেছি, “উনি কেন আমাকে হয়রানি করছেন? এটা তো করা উচিত নয়।” তখন ওই লোক উল্টোটা বলে। সে এমনভাবে বলে, যেন ওই ব্যক্তি তার মালিক। আপনার হয়তো মালিক হতে পারে, কিন্তু আমার তো তিনি মালিক নন। তো এটা আমার কাছে খুবই বিরক্তিকর এবং অসম্মানজনক লেগেছে।

আমি যৌন হয়রানিরও শিকার হই। তারা আমাকে নিয়ে যায়, তাদের বস আমাকে শারীরিকভাবে পরীক্ষা করতে চায়। সে আমার গায়ে হাত দিয়ে চেক করার চেষ্টা করে এবং যৌন হয়রানি করার চেষ্টা করে। এটা খুবই বিরক্তিকর।

কিন্তু আমার কাছে শুধু বাংলাদেশি পাসপোর্ট থাকায় আমি কিছু বলতে পারিনি। তখন আমি চিন্তা করেছিলাম, যদি আমার নিউজিল্যান্ড কিংবা অস্ট্রেলিয়ার পাসপোর্ট থাকত, তাহলে সে কখনোই এই কাজটা করতে পারত না। আমি সঙ্গে সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া কিংবা নিউজিল্যান্ডের দূতাবাসে যোগাযোগ করে বিষয়টি মিটিয়ে নিতাম। কিন্তু শুধু বাংলাদেশি পাসপোর্ট থাকায় তারা আমাকে যৌন হয়রানি করার সুযোগ পেয়েছে। আর আমি যদি কিছু বলতাম, তাহলে তারা আমাকে যেকোনো ধরনের ঝামেলায় ফেলতে পারত। সেই ভয়ে আমি বিষয়টা সম্পূর্ণ চেপে গেছি।

তো এটা শুধু ঢোকার সময়ের ঘটনা নয়। আরও কিছু ঘটনা আছে। যেমন, মদিনায় যাওয়ার সময় আমাদের দুপুর দেড়টার দিকে পৌঁছানোর কথা ছিল। সকাল আটটার বাসে উঠেছিলাম। কিন্তু আমাদের রাত সাড়ে দশটার আগে ছাড়েনি। মানে আমাকে আটকে রেখেছিল, ছাড়বে না। তারপর আমার কাছে ৫২০ ডলার ছিল, আর ৮০ ডলার ড্রাইভার দিয়ে আমাকে ছাড়িয়েছে। শেষ পর্যন্ত বাসের ড্রাইভার না থাকলে আমি ওখান থেকে বের হতে পারতাম না। সত্যি কথা বলতে, জর্ডানের বাসের ড্রাইভার আমাকে বাঁচিয়েছেন। তিনি যদি না বাঁচাতেন, আমি ওখান থেকে আসতে পারতাম না।

তো যাই হোক, এটা আমার একটা ঝুঁকিপূর্ণ অভিজ্ঞতা। তারপরে ওখান থেকে বের হলাম খুব বিধ্বস্ত ছিলাম। কোনো খাবারও খাওয়ানো হয়নি। তারপর পরের দিন রাতে এক টার দিকে আমরা আরেকটা শহরে পৌঁছাই। শহরটার নাম আল-খোবার। ওখানে আমরা খেয়েছিলাম। আমার কাছে নগদ টাকা ছিল না। তাই কার্ড দিয়ে খাবার কিনেছিলাম।

এরপর ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে মদিনায় আমার পাশের সিটের মহিলাটি নেমে যান। তো আমি চিন্তা করি, আমিও নেমে যাই। যদিও এটা একটা পবিত্র জায়গা, আমার মনে হয়েছিল, আল্লাহ আমার ডাক শুনেছেন বলেই আমি নেমে গিয়েছি।

নেমে যাওয়ার পরে মনে হলো, আমি ওখানে হজ করব। আমি আমার বাবাকে ফোন করলাম। বাবা বললেন, তাহলে তুমি হজ করো। তিনি আমাকে বললেন, কীভাবে বলতে হবে। তো আমি সেভাবেই মদিনায় থাকার ব্যবস্থা করলাম।

তারপরে আমাদের হায়দার ভাই, তাঁর সঙ্গে ওখানে দেখা হলো। উনিও এসেছিলেন। যাই হোক, উনার সঙ্গেও দেখা হলো।

মদিনায় আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছিল, সেখানে একটা শান্তি ছিল, একটা পিস ছিল। বেলালের মসজিদের সামনে গিয়েছিলাম। ভালো লেগেছে।

তারপরে মদিনা থেকে আমার বাস ছিল মক্কায়। মক্কায় আমাদের আরেকজন ট্রাভেলার বড় ভাই আছেন, তাঁর নাম আবদুল করিম। উনি আমাকে আগে থেকেই আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আমি তাঁর বাসায় গিয়েছিলাম।

আমি যখন যাই, তখন জানতাম না যে ট্রেনে উঠতে হলে এক ঘণ্টা ৪৫ মিনিট আগে যেতে হয়। তাই ট্রেন মিস করি। তারপরে ওখানকার বাঙালি ভাইয়েরা আমাকে শেয়ার ট্যাক্সিতে উঠিয়ে দেন।

শেয়ার ট্যাক্সিতে আমার যে ঘটনাটা ঘটেছিল, সেটা না বললে পারি না। একজন বয়স্ক ভদ্রলোক তাঁর পাশে কফি রেখেছিলেন। কফি হাতে নেওয়ার সময় তিনি বারবার হাত ঘুরিয়ে আমার বুকে হাত লাগানোর চেষ্টা করছিলেন। এটা যে কতটা বিরক্তিকর, তা বলার মতো নয়। তিনি আমাকে শারীরিকভাবে হয়রানি করার চেষ্টা করেন।

তো যাই হোক, এভাবে রাত তিনটার সময় মক্কায় পৌঁছাই। পরের দিন সেখানে থাকি। তারপরের দিন বৃষ্টি হয়। বৃষ্টি হওয়ার কারণে আমার জেদ্দায় যাওয়ার কথা থাকলেও যেতে সমস্যা হয়। জেদ্দায় আমার বন্ধু আহমেদ ছিল, তার সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল। কিন্তু সে দাম্মামে থাকে। তাই তার সঙ্গে দেখা হয়নি।

আমি যখন জেদ্দায় যাওয়ার চেষ্টা করি, তখন বৃষ্টি হয়। শুনেছিলাম, ৮৬ বছরে একবার এমন বৃষ্টি হয়েছিল। সেই বৃষ্টিতে সমস্ত জায়গা ভেসে যায় এবং আমি খুব আটকে যাই।

তারপরে পরের দিন রিয়াদে যাওয়ার বাস ছিল। সকাল সাড়ে সাতটার দিকে বাস ছাড়ার কথা ছিল, কিন্তু বাস চলছিল না। বাসটা আটকে যায়, সমস্যা হয়। তখন আমি, আমার পাশে থাকা একজন সৌদি ভদ্রলোক এবং তাঁর ১১ বছরের মেয়ে বাস থেকে নিচে নামি। আমরা অন্য গাড়ি থামিয়ে বাসটিকে সাহায্য করার চেষ্টা করি।

ওটা ছিল মরুভূমির মাঝখানে। আমি যখন বাস থামানোর জন্য রাস্তায় দাঁড়াই, তখন কাউকে অনুসরণ করিনি। আমি শার্ট পরেছিলাম, লাল একটা শার্ট। তাই সহজেই যে কারও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারছিলাম।

সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের একটা গাড়ি চলে আসে। পুলিশ এসে আমাকে ধরে। তখন পুলিশটি আমাকে খুব হয়রানি করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু ওই ভদ্রলোক এসে আমাকে বাঁচান। এরপর আমি বাঁচলাম।

আমি দেখলাম, আমি বাংলাদেশি হয়েও কেন রাস্তায় গাড়ি থামানোর জন্য নেমেছি, সে জন্য তারা আমাকে নিয়ে যাবে—এমন একটা ভাব। তখন বুঝে গেলাম, এই দেশটা বাংলাদেশি হিসেবে আমার জন্য নিরাপদ নয়। কালো রঙের মানুষদের জন্য একেবারেই নিরাপদ নয়।

পৃথিবীর মধ্যে একটা দেশ, যেখানে আমরা মুসলমান বলে পৃথিবীর সবকিছু দিয়ে দিই, আমরা সৌদি আরবকে অনুসরণ করি। সৌদি আরবে কী হচ্ছে, সৌদির নামে আমাদের ছেলেমেয়েদের নাম রাখি। সৌদির মেয়েরা যেভাবে বোরকা পরে, আমাদের দেশের মেয়েরাও সেভাবে বোরকা পরে। সৌদির ছেলেরা যেভাবে চুল কাটে, আমাদের দেশের ছেলেরাও সেভাবে চুল কাটে, দাড়ি রাখে। সবকিছুতেই সৌদি আরবকে অনুসরণ করে।

অথচ আমার কাছে মনে হয়েছে, এই দেশটাই পৃথিবীর মধ্যে আমাদের জন্য সবচেয়ে শত্রুভাবাপন্ন দেশ। সৌদি আরব আমার কাছে এমনই মনে হয়েছে। তো এখানেই শেষ নয়। আরও অনেক কাহিনি আছে, কারণ আমি সৌদি আরবে সাত-আটবার গিয়েছি। অনেক অনেক গল্প আছে।

তো তারপরে ওই ভদ্রলোক পুলিশটির হাত থেকে আমাকে বাঁচালেন। তারপর আমরা গাড়িতে উঠলাম। এরপর আমাদের আরেকটা গাড়িতে তুলে দেওয়া হলো। পুলিশ বাসটি ঠিক করে দিল। পুলিশ আরেকটা গাড়ি থামাল। তারপর ওই গাড়ির যন্ত্রপাতি দিয়ে বাসটি ঠিক করা হলো। আমি খুব অবাক হলাম যে বাসের ড্রাইভাররা জানেই না, বাস কীভাবে ঠিক করতে হয়।

যাই হোক, তারপর আমি রিয়াদে পৌঁছালাম। রিয়াদে পৌঁছানোর পরে আমাদের খুলনার একজন বাংলাদেশি ভাইয়া ও ভাবির বাসায় গিয়ে উঠলাম। উনি আমাকে দুপুরে খাওয়ালেন। আমি ১১টা বা ১২টার দিকে পৌঁছেছিলাম। রাতটা সেখানে থাকলাম। পরের দিন বিকেল তিনটার সময় আমি আল-আহসা শহরে চলে গেলাম। বাসে করে যাওয়ার কথা ছিল, ট্রেনে যাওয়ার কথা ছিল।

আর ওই দিন একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার ছিল। ওই দিন সৌদি আরব আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছিল। সন্ধ্যায় বাসে ওঠার সময় শুনলাম, সৌদি আরব আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে জিতেছে। আর এ জন্য সৌদি সরকার ইন্টারনেট ফ্রি করে দেয়, মানে সিম কার্ডের ইন্টারনেট আনলিমিটেড করে দেয়।

তো সেগুলো খুবই ইতিবাচক বিষয়। অনেক কিছু ইতিবাচক আছে। আমার মনে হয়, কিং সালমান অনেক ভালো। তিনি অনেক ভালো কাজ করেন এবং প্রগতিশীল কাজ করেন। এটা আমি বলব।

কিন্তু এখানে একটা কথা না বললেই নয়। সৌদি আরবের তরুণ প্রজন্ম অনেক ভালো। কিন্তু ৪৫ থেকে ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মানসিকতা খুব কুৎসিত, তারা একটুও প্রগতিশীল নয় এবং দুর্নীতিগ্রস্ত।

আমি সৌদি আরবের আল-আহসা শহরে একদিন ছিলাম। তারপর সেখান থেকে কাতারে চলে আসি। আল-আহসা শহরে থাকার সময় বাইরে খাওয়া হয়েছিল। তখন বাইরে বের হয়েছিলাম। প্যান্ট-শার্ট পরেই বের হয়েছি। আমার পোশাক নিয়ে খুব একটা ঝামেলা হয়নি। কিন্তু বয়স্করা যখন দেখত, তারাই আমাকে খুব বিরক্ত করত। এটা আমি খুব অনুভব করেছি।

তারপরে আল-আহসা শহর থেকে আসার পরে এখানে তো অন্যরকম। এখানকার তরুণ প্রজন্ম খুব ভালো। আমার হোটেলের প্রায় সব ক্লিনারই বাংলাদেশি। মানে বাংলাদেশিরাই এখানে প্রায় সব ক্লিনারের কাজ করেন। আর হোটেল বয় বা ভালো, উঁচু পদে চাকরি করেন—এমন বাংলাদেশি খুব কম দেখেছি। অধিকাংশই ক্লিনার, কিচেন হ্যান্ড এবং খুব কঠিন কাজ করেন। ওই ধরনের লোকজনই বেশি। দু-একজনকে ভালো পদে দেখা যায়। খুব কমই দেখা যায়।

তো যাই হোক, সেটা বলার জন্য কথাটা বলছি না। বলার বিষয় হলো, এখানকার ক্যাফেগুলো রাত চারটা-পাঁচটা পর্যন্ত খোলা থাকে। ক্যাফেতে ডিজে ডান্স হয়। এটা খুবই ফানি যে, এরা এত বর্বর একটা জাতি, মানে, মদ-গাঁজা না খেয়েও তারা সব সময় হাই থাকে। আর গাঁজা তো তাদের ক্যাফেগুলোতে পাওয়া যায়।

তো এখানে এরকম। তারপরে আরেকবার আমি একদিন থেকে পরের দিন কাতারে চলে আসি। কাতারে আসার পরে তো অন্যরকম। এটা ছিল প্রথমবারের অভিজ্ঞতা, খুবই বাজে, খুবই বাজে।

পরবর্তীতে আমি বুঝে গেছি, সৌদি কেমন। তবে সৌদি সম্পর্কে বলতে চাই, তরুণ প্রজন্মের যারা শিক্ষিত, তারা এত ভালো, এত সাহায্যকারী। যেমন, আমি কাতার বর্ডার থেকে আল-আহসা শহর পর্যন্ত সৌদি ছেলেদের সঙ্গে হিচহাইকিং করে গিয়েছি। সৌদি আরবে আমার একজন কাউচসার্ফিং বন্ধুর বাসায়ও ছিলাম। তারপরে অন্য সৌদি বন্ধুদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়েছে।

আমার অন্যতম সেরা ট্রাভেল বন্ধু ছিল আহমেদ। সে সৌদি আরবের। তার চিন্তাভাবনা একেবারে আলাদা।  তো যাই হোক, অনেকেই আছে যারা নতুন এবং ভিন্ন চিন্তাভাবনার।

নিউজিল্যান্ডেও আমি যখন অকল্যান্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়ি, তখন আমার অনেক সৌদি ছেলে ক্লাসমেট ছিল। তাদের মধ্যে অনেককে পেয়েছি, যাদের চিন্তাভাবনা অন্যরকম। কিন্তু সৌদি আরবে যারা থাকে এবং যারা সরকারি চাকরি করে, তাদের চিন্তাভাবনা বর্বর ধরনের। তারা অন্যরকম।

আরেকটা কথা বলি। পরবর্তীতে আরেকবার হিচহাইকিং করার সময় পুলিশ আমাকে লিফট দিতে চেয়েছিল। আমি যখন রাস্তায় লিফটের জন্য দাঁড়িয়েছিলাম, তখন পুলিশের গাড়ি থামিয়ে আমাকে লিফট দিতে চেয়েছিল। আমি বলেছিলাম, না, আমি নেব না। কারণ আমি জানি, সৌদি আরব কিংবা এমিরেটস এমন একটা দেশ, যেখানে তারা আমাকে ধর্ষণ করে বলবে যে আমি প্রস্টিটিউট। এভাবে বলতে পারে। এই দেশকে কোনো ভরসা নেই।

আমার কাছে মনে হয়েছে, বাংলাদেশিদের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে অনিরাপদ দেশ হচ্ছে সৌদি আরব। আর শুধু আমার কাছে নয়। আমার ইংল্যান্ডের বন্ধু  আছে। ওর বাবা-মা যখন হজ করতে গিয়েছিলেন, তাঁদের ইউকে পাসপোর্ট দেখে বিশ্বাস করেনি। তাঁদের সঙ্গে খুব রূঢ় ব্যবহার করেছে। তারপর যখন তাঁদের ইউকে পাসপোর্ট দেখেছে, তখন বলেছে, “এই পাসপোর্ট তোমরা কোথায় পেয়েছ?” এভাবে তাঁদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে।

তো আমাদের অনেকেই হয়তো বলে না যে সৌদি আরব খারাপ। কিন্তু আমরা যখন ট্রাভেলাররা কথা বলি, তখন সব সময় বলি, সৌদি আরব আমাদের সঙ্গে কতটা খারাপ আচরণ করে।

আর সৌদি আরবে যারা চাকরি করে, তাদের পাসপোর্ট রেখে দেয়। যেমন, আমার ফ্রেঞ্চ বান্ধবী সোফি বলছিল, সৌদি আরবে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের লোকদের পাসপোর্ট রেখে দেয়। কিন্তু যারা শ্বেতাঙ্গ সাদা, তাদের পাসপোর্ট রাখে না। তো যাদের পাসপোর্ট রেখে দেয়, তারা যখন শহরের বাইরে কোথাও বেড়াতে যায়, তখন যেতে পারে না।

তো সৌদি আরব সম্পর্কে খারাপ বলতে গেলে অনেক কিছুই আছে। এটা খুবই সংকীর্ণ মানসিকতার ব্যাপার। আমাদের মহানবী হযরত মুহাম্মদ( সা)কেও সৌদির বর্বর জাতিরা শান্তি দেয়নি। তো আমাদের সাধারণ বাংলাদেশিদের কীভাবে শান্তি দেবে?

আজকে যখন কথা হচ্ছিল, তখন বলা হলো, দুজন ছেলে-মেয়েকে অনৈতিক কাজকর্মের জন্য মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।  বাথরুমে অনৈতিক কাজকর্ম করেছে, সে জন্য তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারপরও কথা হলো, তাদের সেইভাবে শাস্তি দিলেও মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে অন্য দণ্ড দিতে পারত না?

সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে প্রথম দিনই জেনেছি, তাদের তিন দিন ডাকা হয়েছিল এবং একজন পাকিস্তানি লোকের মাধ্যমে ছবি ও ভিডিও দেখে তাদের ধরা হয়েছিল।

কিন্তু তাদের দেশে সবাই এত খারাপ, এত বর্বর—তাদের কিছু হয় না। শুধুমাত্র এই বিচারটা কি বাংলাদেশিদের জন্য? কালো বর্ণের ও গরিব দেশগুলো এই বিচারটা, সবার জন্য নয়।

সৌদি আরব এখনো পর্যন্ত এমন একটা দেশ, যেখানে আমাদের ভারতের কাস্ট সিস্টেমের মতো উচ্চ-নিচু জাতের ব্যাপার আছে। সৌদি আরবে আমাদের জাতটা, বাংলাদেশিদের জাতটা, একেবারে পায়ের নিচে। আমরা ওদের পায়ের নিচে। তারা আমাদের ক্লিনার কিংবা বাসার বুয়া ছাড়া কিছু ভাবতে পারে না। কাজের মেয়ে মনে করে। আমাকে সেভাবেই তারা ট্রিট করেছে।

তো এটা দেখে আমার মনে হয়, এই দেশটা একদিকে উন্নত হচ্ছে, প্রগতিশীল হচ্ছে, সেটা খুবই ভালো ব্যাপার। কিন্তু তাদের সাধারণ মানুষের ব্যবহার এবং অফিসিয়ালভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের ব্যবহার খুবই নিকৃষ্ট।

খুঁজুন