সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
দেশের খবর রাজউকে নকশা অনুমোদনে ৫–৬ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ, কাঠগড়ায় সাইদা ইসলাম

রাজউকে নকশা অনুমোদনে ৫–৬ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ, কাঠগড়ায় সাইদা ইসলাম

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) জোন-৫/১ এলাকায় ভবনের নকশা অনুমোদন, ফাইল নিষ্পত্তি ও অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় জোনটির দায়িত্বপ্রাপ্ত অথরাইজড অফিসার সাইদা ইসলামের বিরুদ্ধে নকশা অনুমোদনের জন্য ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবি, ফাইল আটকে রাখা এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় শিথিলতার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সেবাগ্রহীতা।

অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি নির্ধারিত ফি পরিশোধের পাশাপাশি নকশা অনুমোদনের জন্য অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হচ্ছে। এতে বাড়ির মালিক ও ভবন নির্মাণে আগ্রহী সাধারণ নাগরিকেরা আর্থিক চাপের মুখে পড়ছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পাওয়া না যাওয়ায় অভিযোগগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

নকশা অনুমোদনে লাখ লাখ টাকা দাবির অভিযোগ

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, জোন-৫/১ এলাকায় পাঁচ থেকে ছয়তলা আবাসিক ভবনের নকশা অনুমোদনের জন্য ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবি করা হয়। তাঁদের অভিযোগ, ভবনের উচ্চতা ও আকারভেদে ফাইল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ লেনদেনের চাপ রয়েছে।

একজন বাড়ির মালিকের দাবি, সরকারি ফি ও নির্মাণ ব্যয়ের বাইরে নকশা অনুমোদনের জন্য বিপুল অঙ্কের অর্থ দিতে হলে সাধারণ মানুষের পক্ষে ভবন নির্মাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

অভিযোগকারীদের আরও দাবি, ঘুষের পরিমাণ নিয়ে আপত্তি জানালে সাইদা ইসলাম নাকি বলেন, এই অর্থের ভাগ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও দিতে হয়। তবে এমন বক্তব্যের সত্যতা নিশ্চিত করার মতো স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তাদের বক্তব্যও জানা প্রয়োজন।

অবৈধ ভবনের বিরুদ্ধে অভিযান নিয়ে প্রশ্ন

অনুমোদিত নকশার বাইরে নির্মিত কিংবা অনুমোদনহীন ভবনের বিরুদ্ধে রাজউকের অভিযান পরিচালনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীরা।

তাঁদের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার পরও অবৈধ নির্মাণ পুরোপুরি বন্ধ করা হয় না। বিদ্যুৎ বা গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা কিংবা মিটার খুলে নেওয়ার মতো পদক্ষেপের পর আবারও নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার ঘটনা ঘটছে বলে দাবি তাঁদের।

অভিযোগকারীদের মতে, প্রভাবশালী ভবনমালিকদের ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া এবং অন্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে ভিন্ন নীতি অনুসরণের অভিযোগ প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে নির্দিষ্ট ভবন, অভিযান পরিচালনার তারিখ এবং সংশ্লিষ্ট আদেশ যাচাই করা ছাড়া এসব অভিযোগের ব্যাপ্তি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

পরিদর্শকদের কাজে হস্তক্ষেপের অভিযোগ

মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী ইমারত পরিদর্শকদের কাজেও সাইদা ইসলাম হস্তক্ষেপ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কোনো ভবনের বিরুদ্ধে নোটিশ দেওয়া বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আগে তাঁকে অবহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

তবে এ ধরনের নির্দেশ দাপ্তরিক সমন্বয়ের অংশ, নাকি আইন প্রয়োগে বাধা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।

অর্ধশতাধিক ফাইল আটকে থাকার দাবি

নকশা অনুমোদন ও অন্যান্য দাপ্তরিক কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সাইদা ইসলামের ব্যক্তিগত আইডিতে অর্ধশতাধিক অনুমোদনের ফাইল নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, অতিরিক্ত অর্থের চাহিদা পূরণ না হলে কিছু ফাইলের অগ্রগতি থেমে থাকে। এতে সেবাগ্রহীতাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে এবং ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তবে ফাইলের প্রকৃত সংখ্যা, কত দিন ধরে সেগুলো আটকে রয়েছে এবং বিলম্বের প্রশাসনিক কারণ জানতে রাজউকের সংশ্লিষ্ট শাখার নথি ও আবেদনকারীদের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।

আইন কী বলছে

বাংলাদেশে ভবন নির্মাণ ও নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন, বিধিমালা এবং অনুমোদনের শর্ত অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় বা অনুমোদন ছাড়া নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। একইভাবে সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

তবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা এবং আদালত বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের তদন্তে তা প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। তাই সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ক্ষেত্রে যথাযথ তদন্ত ও নথিপত্র যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাধীন তদন্তের দাবি

রাজউকের জোন-৫/১ এলাকার এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের মতে, নকশা অনুমোদনের ফাইল, আবেদন নিষ্পত্তির সময়সীমা, মোবাইল কোর্টের নথি এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে আইনসম্মতভাবে অনুসন্ধান করা হলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে।

এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

অভিযুক্ত সাইদা ইসলামের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলোর সরাসরি জবাব না দিয়ে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মনীতি ও বিধিমালার প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন বলে অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তবে তাঁর পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য, অভিযোগগুলোর বিষয়ে ব্যাখ্যা এবং রাজউকের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত, নথিপত্র যাচাই এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্যের ভিত্তিতেই এসব অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব।

খুঁজুন