ইতিহাসের পাতায় লি কুয়ান ইউ হয়তো একজন চতুর হিসাব রক্ষক হতে পারেন, কিন্তু তিনি মহাকাব্যের কবি ছিলেন না। সিঙ্গাপুরকে তিনি হয়তো প্রাচ্যের এক ঝকঝকে বাণিজ্যিক কেন্দ্রে রূপ দিয়েছেন, কিন্তু একটি মানচিত্রের জন্ম দিতে গিয়ে যে রক্ত, ছাই আর আত্মত্যাগের অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয় সেই মহাকাব্যিক বেদনার অংক তাঁর জানা ছিল না। তাই তাঁর বইয়ের পাতায় যা উঠে এসেছে, তা কেবল একজন বণিক-রাষ্ট্রনায়কের সংকীর্ণ চোখ দিয়ে দেখা অসম্পূর্ণ হিসেব-নিকেশ; কোনো ইতিহাস স্রষ্টার আত্মোপলব্ধি নয়।
আজ লি কুয়ান ইউ-এর বইয়ের পাতা থেকে অর্ধেক সত্য বের করে এনে যারা কুৎসা রটান, তাদের জন্য ইতিহাসের সত্য পাঠ অত্যন্ত জরুরি।
প্রথমত, প্রেক্ষাপটের সেই রক্তভেজা ক্যানভাসটাকে একটু উপলব্ধি করুন। ১৯৭৩ সাল। বাংলাদেশের মাটি তখনো ৩০ লাখ শহীদের তাজা রক্তে আর্দ্র, সাড়ে সাত কোটি মানুষের দীর্ঘশ্বাসে বাতাস তখনো ভারী। একটা আস্ত দেশকে শ্মশান বানিয়ে দিয়ে গেছে পাকিস্তানি হানাদারেরা। ব্যাংক শূন্য, বন্দর মাইন বিদ্ধ, খেতের ফসল ভস্মীভূত। সেই শ্মশানের ছাইভস্ম ফুঁড়ে দাঁড়ানো এক সদ্য জাত মহীরূহ জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান।
লি কুয়ান ইউ তাঁর বইয়ে পরম অজ্ঞতায় বা অতি-উৎসাহে যে বিমানটিকে শেখ মুজিবের "নিজস্ব ভিআইপি প্রমোদতরী" (his own aircraft) বলে চটুল মন্তব্য করেছেন, তা ছিল এক পরম ঐতিহাসিক মিথ্যাচার।
যুদ্ধবিধ্বস্ত সেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধানের কোনো ব্যক্তিগত বিলাস বিমানের মালিকানা তো দূরে থাক, নিজের দূরপাল্লার কোনো বিমানই ছিল না। ভারতের মহারাজের দেওয়া একটা মাত্র ডিসি-৩ (DC-3) কিংবা ইন্দিরা গান্ধী সরকারের দেওয়া ফকার এফ-২৭ (Fokker F27) দিয়ে তখন অভ্যন্তরীণ রুট সচল রাখার প্রাণপণ লড়াই চলছিল। আন্তর্জাতিক রুটের জন্য সদ্য গঠিত 'বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স' তখন ব্রিটিশ ক্যালেডোনিয়ান থেকে একটা বোয়িং ৭০৭ (Boeing 707) 'ওয়েট-লিজে' (ভাড়ায়) চালিয়ে যাত্রা শুরু করেছে মাত্র।
সেই ভাড়াকৃত বাণিজ্যিক বিমানটিকেই জাতির পিতা অটোয়া সম্মেলনে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী হিসেবে ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কারণ, সাড়ে সাত কোটি মানুষের প্রতিনিধি বিশ্বমঞ্চে কমার্শিয়াল ফ্লাইটের টিকিট কেটে সিটে বসে যেতে পারতেন, কিন্তু তাতে মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হতো সদ্য স্বাধীন এক সার্বভোম বাংলাদেশের। লি কুয়ান ইউ যাকে বিলাসী ‘পার্সোনাল জেট’ মনে করেছেন, তা ছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একমাত্র দূরপাল্লার ভাড়াকৃত কমার্শিয়াল বিমান।
বণিক হৃদয় লি কুয়ান ইউ হিসেব করেছেন আট দিনের বিমান দাঁড়িয়ে থাকার পার্কিং ফি আর জ্বালানির খরচ। কিন্তু রাজনীতি কি শুধুই কোনো করপোরেট বোর্ডের ব্যালেন্স শিট? কূটনীতি কি কেবল বিমানের পার্কিং চার্জের হিসাব? অটোয়ার বিমানবন্দরে বাংলাদেশ লেখা সেই বোয়িং ৭০৭ বিমানটি আট দিন অলস বসে ছিল না; তা ছিল বিশ্বমঞ্চে এক বজ্রনির্ঘোষ রাজনৈতিক ঘোষণা। তা বলছিল - "বাঙালি দমে যায়নি, বাঙালি মুছে যায়নি, বাঙালি আজ বিশ্বমানচিত্রে নিজের সার্বভৌম পতাকা উড্ডীন করেছে।"
লি কুয়ান ইউ আফ্রিকার স্বৈরশাসকদের বিলাসী ক্যাডিলাকের রূপক টেনেছেন। কিন্তু তিনি যার দিকে আঙুল তুলেছেন, তিনি কোনো ক্ষমতার হাটে বিক্রি হওয়া পুতুল-নেতা ছিলেন না। তিনি শেখ মুজিব। হিমালয়সম এক ব্যক্তিত্ব, যাঁর বুকের ছাতি আর কণ্ঠের হুঙ্কারে একসময় কেঁপে উঠত দূর করাচির তখত-তাউস। যিনি জীবনের সেরা সময় গুলো কাটিয়েছেন পাকিস্তানের অন্ধকার জেলখানায়, যাঁর জন্য কবর খোঁড়া হয়েছিল ফাঁসির মঞ্চের ঠিক পাশে। যে মানুষটি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর গদি আর ক্ষমতার প্রলোভন ধূলার মতো পায়ে ঠেলে দিয়ে ফাঁসির রজ্জুকে চুম্বন করতে প্রস্তুত ছিলেন, তাঁকে বিলাসিতার দাঁড়িপাল্লায় মাপা লি কুয়ান ইউ-এর মতো সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির মানুষের চরম ধৃষ্টতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
লি কুয়ান ইউ হয়তো সাহায্য চাওয়ার সাথে 'বিনয়' আর 'দরিদ্রতার অভিনয়' দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেখ মুজিব অটোয়াতে সাহায্য চাইতে গিয়েছিলেন কোনো হাত পাততে যাওয়া ভিক্ষুকের মতো নয়; তিনি গিয়েছিলেন অধিকার আদায় করতে, বিশ্ব বিবেকের কাছে পাওনা কড়ায়-গণ্ডায় বুঝিয়ে নিতে।
লি কুয়ান ইউ চিনেছেন ডলারের মূল্য, আর শেখ মুজিব চিনেছেন একটি জাতির আত্মসম্মান ও স্বাধিকারের মূল্য। সিঙ্গাপুর গড়ে উঠেছে বাণিজ্যের ওপর, আর বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছে অগ্নিকুণ্ড থেকে, রক্তসাগরের ঢেউ সাঁতরে। অতএব, ইতিহাস না জেনে লি কুয়ান ইউ-এর চোখে যা ছিল 'অদূরদর্শিতা', রক্তাক্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে তা ছিল এক সদ্য স্বাধীন জাতির আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার মহাকাব্যিক ঘোষণা যা ব্যাঙ্কার আর ব্যালেন্স শিটের ক্ষুদ্র অংক দিয়ে কোনোদিন পরিমাপ করা সম্ভব নয়।
জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার মহাকাবি
জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার মহাকাবি
ইতিহাসের পাতায় লি কুয়ান ইউ হয়তো একজন চতুর হিসাব রক্ষক হতে পারেন, কিন্তু তিনি মহাকাব্যের কবি ছিলেন না। সিঙ্গাপুরকে তিনি হয়তো প্রাচ্যের এক ঝকঝকে বাণিজ্যিক কেন্দ্রে রূপ দিয়েছেন, কিন্তু একটি মানচিত্রের জন্ম দিতে গিয়ে যে রক্ত, ছাই আর আত্মত্যাগের অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয় সেই মহাকাব্যিক বেদনার অংক তাঁর জানা ছিল না। তাই তাঁর বইয়ের পাতায় যা উঠে এসেছে, তা কেবল একজন বণিক-রাষ্ট্রনায়কের সংকীর্ণ চোখ দিয়ে দেখা অসম্পূর্ণ হিসেব-নিকেশ; কোনো ইতিহাস স্রষ্টার আত্মোপলব্ধি নয়। আজ লি কুয়ান ইউ-এর বইয়ের পাতা থেকে অর্ধেক সত্য বের করে এনে যারা কুৎসা রটান, তাদের জন্য ইতিহাসের সত্য পাঠ অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত, প্রেক্ষাপটের সেই রক্তভেজা ক্যানভাসটাকে একটু উপলব্ধি করুন। ১৯৭৩ সাল। বাংলাদেশের মাটি তখনো ৩০ লাখ শহীদের তাজা রক্তে আর্দ্র, সাড়ে সাত কোটি মানুষের দীর্ঘশ্বাসে বাতাস তখনো ভারী। একটা আস্ত দেশকে শ্মশান বানিয়ে দিয়ে গেছে পাকিস্তানি হানাদারেরা। ব্যাংক শূন্য, বন্দর মাইন বিদ্ধ, খেতের ফসল ভস্মীভূত। সেই শ্মশানের ছাইভস্ম ফুঁড়ে দাঁড়ানো এক সদ্য জাত মহীরূহ জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। লি কুয়ান ইউ তাঁর বইয়ে পরম অজ্ঞতায় বা অতি-উৎসাহে যে বিমানটিকে শেখ মুজিবের "নিজস্ব ভিআইপি প্রমোদতরী" (his own aircraft) বলে চটুল মন্তব্য করেছেন, তা ছিল এক পরম ঐতিহাসিক মিথ্যাচার। যুদ্ধবিধ্বস্ত সেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধানের কোনো ব্যক্তিগত বিলাস বিমানের মালিকানা তো দূরে থাক, নিজের দূরপাল্লার কোনো বিমানই
ছিল না। ভারতের মহারাজের দেওয়া একটা মাত্র ডিসি-৩ (DC-3) কিংবা ইন্দিরা গান্ধী সরকারের দেওয়া ফকার এফ-২৭ (Fokker F27) দিয়ে তখন অভ্যন্তরীণ রুট সচল রাখার প্রাণপণ লড়াই চলছিল। আন্তর্জাতিক রুটের জন্য সদ্য গঠিত 'বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স' তখন ব্রিটিশ ক্যালেডোনিয়ান থেকে একটা বোয়িং ৭০৭ (Boeing 707) 'ওয়েট-লিজে' (ভাড়ায়) চালিয়ে যাত্রা শুরু করেছে মাত্র। সেই ভাড়াকৃত বাণিজ্যিক বিমানটিকেই জাতির পিতা অটোয়া সম্মেলনে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী হিসেবে ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কারণ, সাড়ে সাত কোটি মানুষের প্রতিনিধি বিশ্বমঞ্চে কমার্শিয়াল ফ্লাইটের টিকিট কেটে সিটে বসে যেতে পারতেন, কিন্তু তাতে মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হতো সদ্য স্বাধীন এক সার্বভোম বাংলাদেশের। লি কুয়ান ইউ যাকে বিলাসী ‘পার্সোনাল জেট’ মনে করেছেন, তা ছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একমাত্র দূরপাল্লার ভাড়াকৃত কমার্শিয়াল বিমান। বণিক হৃদয় লি কুয়ান ইউ হিসেব করেছেন আট দিনের বিমান দাঁড়িয়ে থাকার পার্কিং ফি আর জ্বালানির খরচ। কিন্তু রাজনীতি কি শুধুই কোনো করপোরেট বোর্ডের ব্যালেন্স শিট? কূটনীতি কি কেবল বিমানের পার্কিং চার্জের হিসাব? অটোয়ার বিমানবন্দরে বাংলাদেশ লেখা সেই বোয়িং ৭০৭ বিমানটি আট দিন অলস বসে ছিল না; তা ছিল বিশ্বমঞ্চে এক বজ্রনির্ঘোষ রাজনৈতিক ঘোষণা। তা বলছিল - "বাঙালি দমে যায়নি, বাঙালি মুছে যায়নি, বাঙালি আজ বিশ্বমানচিত্রে নিজের সার্বভৌম পতাকা উড্ডীন করেছে।" লি কুয়ান ইউ আফ্রিকার স্বৈরশাসকদের বিলাসী ক্যাডিলাকের রূপক টেনেছেন। কিন্তু তিনি যার দিকে আঙুল তুলেছেন, তিনি
কোনো ক্ষমতার হাটে বিক্রি হওয়া পুতুল-নেতা ছিলেন না। তিনি শেখ মুজিব। হিমালয়সম এক ব্যক্তিত্ব, যাঁর বুকের ছাতি আর কণ্ঠের হুঙ্কারে একসময় কেঁপে উঠত দূর করাচির তখত-তাউস। যিনি জীবনের সেরা সময় গুলো কাটিয়েছেন পাকিস্তানের অন্ধকার জেলখানায়, যাঁর জন্য কবর খোঁড়া হয়েছিল ফাঁসির মঞ্চের ঠিক পাশে। যে মানুষটি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর গদি আর ক্ষমতার প্রলোভন ধূলার মতো পায়ে ঠেলে দিয়ে ফাঁসির রজ্জুকে চুম্বন করতে প্রস্তুত ছিলেন, তাঁকে বিলাসিতার দাঁড়িপাল্লায় মাপা লি কুয়ান ইউ-এর মতো সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির মানুষের চরম ধৃষ্টতা ছাড়া আর কিছুই নয়। লি কুয়ান ইউ হয়তো সাহায্য চাওয়ার সাথে 'বিনয়' আর 'দরিদ্রতার অভিনয়' দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেখ মুজিব অটোয়াতে সাহায্য চাইতে গিয়েছিলেন কোনো হাত পাততে যাওয়া ভিক্ষুকের মতো নয়; তিনি গিয়েছিলেন অধিকার আদায় করতে, বিশ্ব বিবেকের কাছে পাওনা কড়ায়-গণ্ডায় বুঝিয়ে নিতে। লি কুয়ান ইউ চিনেছেন ডলারের মূল্য, আর শেখ মুজিব চিনেছেন একটি জাতির আত্মসম্মান ও স্বাধিকারের মূল্য। সিঙ্গাপুর গড়ে উঠেছে বাণিজ্যের ওপর, আর বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছে অগ্নিকুণ্ড থেকে, রক্তসাগরের ঢেউ সাঁতরে। অতএব, ইতিহাস না জেনে লি কুয়ান ইউ-এর চোখে যা ছিল 'অদূরদর্শিতা', রক্তাক্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে তা ছিল এক সদ্য স্বাধীন জাতির আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার মহাকাব্যিক ঘোষণা যা ব্যাঙ্কার আর ব্যালেন্স শিটের ক্ষুদ্র অংক দিয়ে কোনোদিন পরিমাপ করা সম্ভব নয়।
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
রওশন টাওয়ার, (লিফট-৮) ১৫২/২/এ২ গ্রীণ রোড ,
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ ।
মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত