১৯৭৫ সালের একুশে জুলাই। ফাঁসির মঞ্চে ওঠার আগে শেষবারের মতো তাঁকে যখন জিজ্ঞাসা করা হলো—‘আপনার কোনো শেষ ইচ্ছে আছে কি না?’
মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও কোনো ব্যক্তিগত চাওয়া ছিল না সেই লৌহমানবিক বীরের। তিনি শান্ত অথচ জোরালো কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমার মৃত্যুর বদলে আমি সাধারণ মানুষের শান্তি কামনা করছি।’
তিনি কর্নেল আবু তাহের—বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ধূমকেতু, একখণ্ড জীবন্ত আগুন, যাঁর পুরো জীবনটাই ছিল আপসহীন জেদ আর ভালোবাসার এক মহাকাব্য।
বিদ্রোহের সেই অবিচল ছায়া
১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর। ব্যর্থ এক অভ্যুত্থানের অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহিতার ট্যাগ লাগিয়ে সামরিক আদালতে তাঁকে দেওয়া হয়েছিল ফাঁসির আদেশ। তারপর থেকে বন্দিদশার অন্ধকার প্রকোষ্ঠই হয়েছিল তাঁর ঠিকানা।
১৯ জুলাইয়ের দুপুরের পর হঠাৎ প্রেসিডেন্ট সায়েমের দপ্তর থেকে নির্দেশ এল—তাহেরের সঙ্গে দেখা করতে হবে তাঁর পরিবারকে। কারাগারের ভারী দরজার ওপারে এসে দাঁড়ালেন বড় ভাই আরিফুর রহমান, মা-বাবা, আদরের ছেলে যীশু, বড় ভাইর ছেলে বাপী, বোন জলি এবং স্ত্রী লুৎফা তাহের।
সবার সামনে যখন তিনি এলেন, মুখে লেপ্টে ছিল এক চিলতে মৃদু হাসি। সবকিছু যেন একদম স্বাভাবিক! বড় ভাই আরিফুর রহমান স্নেহের সুরে বললেন, ‘ভবিষ্যতের কথা ভেবে ক্ষমা চাও। তারা তোমাকে ক্ষমা করে দিতে পারবেন।’
তাহের মৃদু হাসলেন। দৃঢ়প্রতিজ্ঞ কণ্ঠে বললেন, ‘আমি তো চোর নই যে ক্ষমা ভিক্ষা করব। আমার ফাঁসি হতে পারে না।’
পাশে থাকা লুৎফা তাহের আকুতিভরা কণ্ঠে বললেন, ‘ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যতের কথা একটাবার ভেবে দেখো।’
তাহের কোনো ভাবনার গভীরে না গিয়ে হাসিমুখে জবাব দিলেন, ‘আমার ছেলেমেয়েদের দেশের মানুষ দেখবে।’
মৃত্যুর ঠিক আগে সন্তানদের উদ্দেশে রেখে যাওয়া তাঁর শেষ চিঠিটিতে তিনি লিখে গেছিলেন সেই চিরন্তন সত্য—“নীতু, যীশু ও মিশুর কথা—সবার কথা মনে পড়ে। তাদের জন্য অর্থসম্পদ কিছুই আমি রেখে যাইনি। কিন্তু আমার গোটা জাতি রয়েছে তাদের জন্য। আমরা দেখেছি শত সহস্র উলঙ্গ মায়া-মমতা ভালোবাসাবঞ্চিত শিশু। তাদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় আমরা গড়তে চেয়েছি।”
মৃত্যুর চেহারায় হাসি
২১শে জুলাই সকালে যখন তাঁকে জানানো হলো, আজই কার্যকর হবে তাঁর ফাঁসি—সংবাদবাহককে এক ফোঁটা কম্পনহীন কণ্ঠে ধন্যবাদ জানালেন তিনি। এরপর সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবে শেষ করলেন নিজের খাবার।
এক হুজুর এলেন তাঁকে তওবা পড়াতে। তাহের শান্ত চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমাদের সমাজের পাপাচার আমাকে স্পর্শ করতে পারেনি। আমি কখনো কোনো পাপকর্মের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। আমি নিষ্পাপ। তুমি এখন যেতে পারো, আমি ঘুমাবো।’
সত্যিই, এরপর তিনি গভীর ও নিশ্চিন্ত ঘুমে তলিয়ে গেলেন। রাত ৩টার দিকে যখন তাঁকে জাগানো হলো, তিনি সময় জেনে নিয়ে নিয়মমাফিক দাঁত মাজলেন, শেভ করলেন, গোসল সারলেন। উপস্থিত কেউ সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিলে তিনি শান্ত গলায় ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আমি আমার পবিত্র শরীরে তোমাদের হাত লাগাতে চাই না।’
এরপর নিজেই নিজের কৃত্রিম পাখানি লাগিয়ে নিলেন। প্যান্ট-জুতা পরে, চমৎকার একটা শার্ট গায়ে জড়িয়ে, ঘড়িটি হাতে পরে, মাথার চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়ে নিলেন। উপস্থিত সবার সামনে আম খেলেন, চা খেলেন এবং একটা সিগারেট ধরিয়ে সান্ত্বনার সুরে বললেন—“তোমরা এমন মনমরা হয়ে পড়েছো কেন? মৃত্যুর চেহারায় আমি হাসি ফোটাতে চেয়েছিলাম। মৃত্যু আমাকে পরাভূত করতে পারে না।”
ফাঁসির মঞ্চে ওঠার আগে স্ত্রী লুৎফাকে লেখা তাঁর শেষ পঙক্তিগুলো আজও শিহরণ জাগায়—“আমাকে কেউ হত্যা করতে পারে না। আমি আমার সমগ্র জাতির মধ্যে প্রকাশিত। আমাকে হত্যা করতে হলে সমগ্র জাতিকে হত্যা করতে হবে।”
এরপর ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি আবৃত্তি করেছিলেন সেই অমর কবিতাটি—
> “জন্মেছি, সারা দেশটাকে কাঁপিয়ে তুলতে, কাঁপিয়ে দিলাম।
> জন্মেছি, তোদের শোষণের হাত দুটো ভাঙব বলে, ভেঙে দিলাম।
> জন্মেছি, মৃত্যুকে পরাজিত করব বলে, করেই গেলাম
> জন্ম আর মৃত্যুর বিশাল পাথর রেখে গেলাম
> পাথরের নিচে, শোষক আর শাসকের কবর দিলাম
> পৃথিবী, অবশেষে এবারের মতো বিদায় নিলাম।”
পাকিস্তান থেকে কামানের গর্জন
এই জেদ আর একরোখা মনোভাব তাঁকে রাজনীতির ময়দানে যেমন টেনেছিল, তেমনি ১৯৭১ সালের রণাঙ্গনে তাঁকে বানিয়েছিল এক অদ্বিতীয় কিংবদন্তি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে তিনিই একমাত্র বাঙালি অফিসার যিনি পেয়েছিলেন মর্যাদাপূর্ণ ‘মেরুন প্যারাস্যুট উইং’ সম্মাননা।
জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ পেরিয়ে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার সেই ইতিহাস সিনেমার চেয়েও নাটকীয়। তাঁর সঙ্গে পালিয়ে এসেছিলেন মেজর (পরবর্তীতে কর্নেল) জিয়াউদ্দিন বীর উত্তম, মেজর (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল) মঞ্জুর বীর উত্তম এবং ক্যাপ্টেন (পরবর্তীতে কর্নেল) বজলুল গণি পাটোয়ারী বীর প্রতীক।
পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসার আধা মাসের ব্যবধানেই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন কামালপুর বিওপি দখল করার! এর আগের সমস্ত অপারেশন কামালপুরে ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু তাহারের অভিধানে অসম্ভব বলতে কিছু ছিল না।
১৩ নভেম্বর, ১৯৭১। পরদিন ১৪ নভেম্বর—তাহেরের জন্মদিন।
দুপুরে অধীনস্থ কমান্ডারদের নিয়ে বৈঠকে বসলেন ‘কর্তা’ (যুদ্ধে এটিই ছিল তাহেরের গোপন কোড)। সিদ্ধান্ত হলো, জন্মদিনের প্রথম প্রহরে অর্থাৎ রাত ১২টায় আক্রমণ করা হবে কামালপুরে। ভারতীয় মারাঠা, গোর্খা ও গার্ড রেজিমেন্টকে সঙ্গে নিয়ে শুরু হলো অপারেশন। নেতৃত্বে স্বয়ং সেক্টর কমান্ডার মেজর আবু তাহের।
রাত ১২টা বাজতেই গর্জে উঠল আর্টিলারি। প্রায় সাড়ে তিন হাজার শেল নিক্ষিপ্ত হলো কামালপুর বিওপির ওপর। চারদিক আলোর ঝলকানিতে দিনের মতো উজ্জ্বল। মুক্তিযোদ্ধাদের ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে উঠল চারপাশ।
লেফটেন্যান্ট মিজান ওয়াকিটকিতে জানালেন, ‘কর্তা, আমরা পাকিস্তানিদের প্রথম লাইনের বাঙ্কার দখল করে নিয়েছি।’
ভোর হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্ত। মিজানদের সঙ্গে হঠাৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। চরম উৎকণ্ঠায় কমান্ড পোস্ট থেকে উঠে দাঁড়ালেন তাহের। ব্রিগেডিয়ার ক্লেয়ারকে অবাক করে দিয়ে বললেন, ‘আমি ফ্রন্টে যাব, আমার ছেলেদের দেখতে চাই।’
রক্তেভেজা জন্মদিনের ভোর
বান সড়কের ঢালে দুই পা ভাঁজ করে পজিশন নিলেন তাহের। একপাশে ভাই ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল, অন্যপাশে শাখাওয়াত হোসেন বাহার। তাহের কলফ স্টিক দিয়ে পাকিস্তানি বাঙ্কারগুলোর অবস্থান নির্দেশ করছেন, আর বেলাল ওদিকে চালাচ্ছেন গুলি।
হঠাৎ এক বিকট শব্দ। বেলাল লক্ষ্য করলেন, তাঁর ওপর লুটিয়ে পড়ছেন তাহের। তাকিয়ে দেখলেন, তাহেরের বাঁ পা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনোমতে ঝুলে আছে!
বানের জলের মতো রক্ত ঝরছে। পাকিস্তানি সেনারা বুঝতে পেরে উল্লাসে চিৎকার করে এগিয়ে আসছে। ভাই বেলাল দিশাহারা হয়ে ভুলবশত ওয়াকিটকিতে বলে ফেললেন, ‘কর্তা ইজ ডেড।’
কিন্তু কার মৃত্যু! মুক্তিযোদ্ধারা একটি কুঁড়েঘরের দরজা ভেঙে তাতে তুলে নিলেন তাহেরকে। দৌড়ে এসে ভারতীয় বাহিনীর একটি জিপ এনে তাঁকে দ্রুত স্থানান্তরিত করা হলো। জিপে তোলার সময় রক্তাক্ত শরীরেও তাঁর মুখে কোনো ক্লান্তি ছিল না। আনোয়ারকে কাছে ডেকে তিনি দৃঢ়স্বরে বলে গেলেন—“দেখো আমার মাথায় ওরা আঘাত করতে পারে নাই। তোমরা কামালপুর মুক্ত করবে। আমি ফিরে এসে যেন দেখি কামালপুর মুক্ত হয়েছে।”
চিকিৎসার জন্য তাঁকে প্রথমে তুরা এবং পরে গৌহাটিতে নিয়ে যাওয়া হলো। সেদিন তাহের আহত হওয়ায় সেবার কামালপুর দখল নেওয়া সম্ভব হয়নি। ঠিক ২০ দিন পর তুমুল নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে মুক্ত হয়েছিল কামালপুর। তাহেরের কাছে কামালপুর এক আজীবনের গোলকধাঁধাই থেকে গেল।
এক পরিবার, এক ইতিহাস
এই মহান বীরের রক্তে মিশে ছিল দেশপ্রেম। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর এই অদম্য যাত্রায় তাঁর পাশে ছায়ার মতো লড়েছিলেন তাঁর ভাই-বোনেরা। তাহের ছাড়াও তাঁর ভাই আবু ইউসুফ পেয়েছেন বীরবিক্রম খেতাব, ভাই ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল ও শাখাওয়াত হোসেন বাহার পেয়েছেন বীর প্রতীক খেতাব। ভাই-বোনদের এই অপ্রতিরোধ্য দলটিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে ডাকা হতো ‘ব্রাদার্স প্লাটুন’ নামে।
কর্নেল তাহের আজ সশরীরে নেই, কিন্তু বাংলা মায়ের প্রতিটি ধূলিকণায়, প্রতিটি মুক্ত বাতাসে তাঁর সেই অদম্য জেদ আর মুক্তির গান চিরকাল প্রতিধ্বনিত হবে।
কর্নেল আবু তাহের—বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ধূমকেতু
কর্নেল আবু তাহের—বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ধূমকেতু
১৯৭৫ সালের একুশে জুলাই। ফাঁসির মঞ্চে ওঠার আগে শেষবারের মতো তাঁকে যখন জিজ্ঞাসা করা হলো—‘আপনার কোনো শেষ ইচ্ছে আছে কি না?’মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও কোনো ব্যক্তিগত চাওয়া ছিল না সেই লৌহমানবিক বীরের। তিনি শান্ত অথচ জোরালো কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমার মৃত্যুর বদলে আমি সাধারণ মানুষের শান্তি কামনা করছি।’ তিনি কর্নেল আবু তাহের—বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ধূমকেতু, একখণ্ড জীবন্ত আগুন, যাঁর পুরো জীবনটাই ছিল আপসহীন জেদ আর ভালোবাসার এক মহাকাব্য। বিদ্রোহের সেই অবিচল ছায়া ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর। ব্যর্থ এক অভ্যুত্থানের অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহিতার ট্যাগ লাগিয়ে সামরিক আদালতে তাঁকে দেওয়া হয়েছিল ফাঁসির আদেশ। তারপর থেকে বন্দিদশার অন্ধকার প্রকোষ্ঠই হয়েছিল তাঁর ঠিকানা। ১৯ জুলাইয়ের দুপুরের পর হঠাৎ প্রেসিডেন্ট সায়েমের দপ্তর থেকে নির্দেশ এল—তাহেরের সঙ্গে দেখা করতে হবে তাঁর পরিবারকে। কারাগারের ভারী দরজার ওপারে এসে দাঁড়ালেন বড় ভাই আরিফুর রহমান, মা-বাবা, আদরের ছেলে যীশু, বড় ভাইর ছেলে বাপী, বোন জলি এবং স্ত্রী লুৎফা তাহের। সবার সামনে যখন তিনি এলেন, মুখে লেপ্টে ছিল এক চিলতে মৃদু হাসি। সবকিছু যেন একদম স্বাভাবিক! বড় ভাই আরিফুর রহমান স্নেহের সুরে বললেন, ‘ভবিষ্যতের কথা ভেবে ক্ষমা চাও। তারা তোমাকে ক্ষমা করে দিতে পারবেন।’ তাহের মৃদু হাসলেন। দৃঢ়প্রতিজ্ঞ কণ্ঠে বললেন, ‘আমি তো চোর নই যে ক্ষমা ভিক্ষা করব। আমার ফাঁসি হতে পারে না।’পাশে থাকা লুৎফা তাহের আকুতিভরা কণ্ঠে বললেন, ‘ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যতের কথা একটাবার ভেবে দেখো।’তাহের কোনো ভাবনার গভীরে না গিয়ে হাসিমুখে জবাব দিলেন, ‘আমার ছেলেমেয়েদের দেশের মানুষ দেখবে।’ মৃত্যুর ঠিক আগে সন্তানদের উদ্দেশে রেখে যাওয়া তাঁর শেষ চিঠিটিতে তিনি লিখে গেছিলেন সেই চিরন্তন সত্য—“নীতু, যীশু ও মিশুর কথা—সবার কথা মনে পড়ে। তাদের জন্য অর্থসম্পদ কিছুই আমি রেখে যাইনি। কিন্তু আমার গোটা জাতি রয়েছে তাদের জন্য। আমরা দেখেছি শত সহস্র উলঙ্গ মায়া-মমতা ভালোবাসাবঞ্চিত শিশু। তাদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় আমরা গড়তে চেয়েছি।” মৃত্যুর চেহারায় হাসি ২১শে জুলাই সকালে যখন তাঁকে জানানো হলো, আজই কার্যকর হবে তাঁর ফাঁসি—সংবাদবাহককে এক ফোঁটা কম্পনহীন কণ্ঠে ধন্যবাদ জানালেন তিনি। এরপর সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবে শেষ করলেন নিজের খাবার।এক হুজুর এলেন তাঁকে তওবা পড়াতে। তাহের শান্ত চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমাদের সমাজের পাপাচার আমাকে স্পর্শ করতে পারেনি। আমি কখনো কোনো পাপকর্মের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। আমি নিষ্পাপ। তুমি এখন যেতে পারো, আমি ঘুমাবো।’ সত্যিই, এরপর তিনি গভীর ও নিশ্চিন্ত ঘুমে তলিয়ে গেলেন। রাত
৩টার দিকে যখন তাঁকে জাগানো হলো, তিনি সময় জেনে নিয়ে নিয়মমাফিক দাঁত মাজলেন, শেভ করলেন, গোসল সারলেন। উপস্থিত কেউ সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিলে তিনি শান্ত গলায় ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আমি আমার পবিত্র শরীরে তোমাদের হাত লাগাতে চাই না।’ এরপর নিজেই নিজের কৃত্রিম পাখানি লাগিয়ে নিলেন। প্যান্ট-জুতা পরে, চমৎকার একটা শার্ট গায়ে জড়িয়ে, ঘড়িটি হাতে পরে, মাথার চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়ে নিলেন। উপস্থিত সবার সামনে আম খেলেন, চা খেলেন এবং একটা সিগারেট ধরিয়ে সান্ত্বনার সুরে বললেন—“তোমরা এমন মনমরা হয়ে পড়েছো কেন? মৃত্যুর চেহারায় আমি হাসি ফোটাতে চেয়েছিলাম। মৃত্যু আমাকে পরাভূত করতে পারে না।” ফাঁসির মঞ্চে ওঠার আগে স্ত্রী লুৎফাকে লেখা তাঁর শেষ পঙক্তিগুলো আজও শিহরণ জাগায়—“আমাকে কেউ হত্যা করতে পারে না। আমি আমার সমগ্র জাতির মধ্যে প্রকাশিত। আমাকে হত্যা করতে হলে সমগ্র জাতিকে হত্যা করতে হবে।”এরপর ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি আবৃত্তি করেছিলেন সেই অমর কবিতাটি—> “জন্মেছি, সারা দেশটাকে কাঁপিয়ে তুলতে, কাঁপিয়ে দিলাম।> জন্মেছি, তোদের শোষণের হাত দুটো ভাঙব বলে, ভেঙে দিলাম।> জন্মেছি, মৃত্যুকে পরাজিত করব বলে, করেই গেলাম> জন্ম আর মৃত্যুর বিশাল পাথর রেখে গেলাম> পাথরের নিচে, শোষক আর শাসকের কবর দিলাম> পৃথিবী, অবশেষে এবারের মতো বিদায় নিলাম।” পাকিস্তান থেকে কামানের গর্জন এই জেদ আর একরোখা মনোভাব তাঁকে রাজনীতির ময়দানে যেমন টেনেছিল, তেমনি ১৯৭১ সালের রণাঙ্গনে তাঁকে বানিয়েছিল এক অদ্বিতীয় কিংবদন্তি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে তিনিই একমাত্র বাঙালি অফিসার যিনি পেয়েছিলেন মর্যাদাপূর্ণ ‘মেরুন প্যারাস্যুট উইং’ সম্মাননা। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ পেরিয়ে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার সেই ইতিহাস সিনেমার চেয়েও নাটকীয়। তাঁর সঙ্গে পালিয়ে এসেছিলেন মেজর (পরবর্তীতে কর্নেল) জিয়াউদ্দিন বীর উত্তম, মেজর (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল) মঞ্জুর বীর উত্তম এবং ক্যাপ্টেন (পরবর্তীতে কর্নেল) বজলুল গণি পাটোয়ারী বীর প্রতীক। পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসার আধা মাসের ব্যবধানেই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন কামালপুর বিওপি দখল করার! এর আগের সমস্ত অপারেশন কামালপুরে ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু তাহারের অভিধানে অসম্ভব বলতে কিছু ছিল না। ১৩ নভেম্বর, ১৯৭১। পরদিন ১৪ নভেম্বর—তাহেরের জন্মদিন।দুপুরে অধীনস্থ কমান্ডারদের নিয়ে বৈঠকে বসলেন ‘কর্তা’ (যুদ্ধে এটিই ছিল তাহেরের গোপন কোড)। সিদ্ধান্ত হলো, জন্মদিনের প্রথম প্রহরে অর্থাৎ রাত ১২টায় আক্রমণ করা হবে কামালপুরে। ভারতীয় মারাঠা, গোর্খা ও গার্ড রেজিমেন্টকে সঙ্গে নিয়ে শুরু হলো অপারেশন। নেতৃত্বে স্বয়ং সেক্টর কমান্ডার মেজর আবু তাহের। রাত ১২টা বাজতেই গর্জে উঠল আর্টিলারি। প্রায় সাড়ে তিন হাজার শেল
নিক্ষিপ্ত হলো কামালপুর বিওপির ওপর। চারদিক আলোর ঝলকানিতে দিনের মতো উজ্জ্বল। মুক্তিযোদ্ধাদের ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে উঠল চারপাশ।লেফটেন্যান্ট মিজান ওয়াকিটকিতে জানালেন, ‘কর্তা, আমরা পাকিস্তানিদের প্রথম লাইনের বাঙ্কার দখল করে নিয়েছি।’ ভোর হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্ত। মিজানদের সঙ্গে হঠাৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। চরম উৎকণ্ঠায় কমান্ড পোস্ট থেকে উঠে দাঁড়ালেন তাহের। ব্রিগেডিয়ার ক্লেয়ারকে অবাক করে দিয়ে বললেন, ‘আমি ফ্রন্টে যাব, আমার ছেলেদের দেখতে চাই।’রক্তেভেজা জন্মদিনের ভোরবান সড়কের ঢালে দুই পা ভাঁজ করে পজিশন নিলেন তাহের। একপাশে ভাই ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল, অন্যপাশে শাখাওয়াত হোসেন বাহার। তাহের কলফ স্টিক দিয়ে পাকিস্তানি বাঙ্কারগুলোর অবস্থান নির্দেশ করছেন, আর বেলাল ওদিকে চালাচ্ছেন গুলি। হঠাৎ এক বিকট শব্দ। বেলাল লক্ষ্য করলেন, তাঁর ওপর লুটিয়ে পড়ছেন তাহের। তাকিয়ে দেখলেন, তাহেরের বাঁ পা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনোমতে ঝুলে আছে!বানের জলের মতো রক্ত ঝরছে। পাকিস্তানি সেনারা বুঝতে পেরে উল্লাসে চিৎকার করে এগিয়ে আসছে। ভাই বেলাল দিশাহারা হয়ে ভুলবশত ওয়াকিটকিতে বলে ফেললেন, ‘কর্তা ইজ ডেড।’ কিন্তু কার মৃত্যু! মুক্তিযোদ্ধারা একটি কুঁড়েঘরের দরজা ভেঙে তাতে তুলে নিলেন তাহেরকে। দৌড়ে এসে ভারতীয় বাহিনীর একটি জিপ এনে তাঁকে দ্রুত স্থানান্তরিত করা হলো। জিপে তোলার সময় রক্তাক্ত শরীরেও তাঁর মুখে কোনো ক্লান্তি ছিল না। আনোয়ারকে কাছে ডেকে তিনি দৃঢ়স্বরে বলে গেলেন—“দেখো আমার মাথায় ওরা আঘাত করতে পারে নাই। তোমরা কামালপুর মুক্ত করবে। আমি ফিরে এসে যেন দেখি কামালপুর মুক্ত হয়েছে।” চিকিৎসার জন্য তাঁকে প্রথমে তুরা এবং পরে গৌহাটিতে নিয়ে যাওয়া হলো। সেদিন তাহের আহত হওয়ায় সেবার কামালপুর দখল নেওয়া সম্ভব হয়নি। ঠিক ২০ দিন পর তুমুল নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে মুক্ত হয়েছিল কামালপুর। তাহেরের কাছে কামালপুর এক আজীবনের গোলকধাঁধাই থেকে গেল। এক পরিবার, এক ইতিহাস এই মহান বীরের রক্তে মিশে ছিল দেশপ্রেম। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর এই অদম্য যাত্রায় তাঁর পাশে ছায়ার মতো লড়েছিলেন তাঁর ভাই-বোনেরা। তাহের ছাড়াও তাঁর ভাই আবু ইউসুফ পেয়েছেন বীরবিক্রম খেতাব, ভাই ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল ও শাখাওয়াত হোসেন বাহার পেয়েছেন বীর প্রতীক খেতাব। ভাই-বোনদের এই অপ্রতিরোধ্য দলটিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে ডাকা হতো ‘ব্রাদার্স প্লাটুন’ নামে। কর্নেল তাহের আজ সশরীরে নেই, কিন্তু বাংলা মায়ের প্রতিটি ধূলিকণায়, প্রতিটি মুক্ত বাতাসে তাঁর সেই অদম্য জেদ আর মুক্তির গান চিরকাল প্রতিধ্বনিত হবে।
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
রওশন টাওয়ার, (লিফট-৮) ১৫২/২/এ২ গ্রীণ রোড ,
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ ।
মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত