রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
সৌদি আরব: পৃথিবীর নিকৃষ্টতম বর্বর দেশ • সিডনিতে চট্টগ্রাম ক্লাব অস্ট্রেলিয়ার স্প্রিং ফেয়ার, সফল আয়োজন • নেপালকে হারিয়ে বাংলাদেশের স্বস্তির জয় • সহকর্মী বেচে থাকতেই তাঁর দুঃসময়ে পাশে দাঁড়াতে শিখি • রিসোর্টের ট্র্যাজেডি আমাদের কী শেখায় • নজরুল ও সিতির শিরশ্ছেদ মানবাধিকার ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের লঙ্ঘন • মেসির জোড়া গোলে আটলান্টাকে ৩-১ ব্যবধানে হারাল ইন্টার মায়ামি • জুনে সতর্কবার্তা, অক্টোবরে দশ মৃত্যু: টুপটুপ রিসোর্টের আগুন থেকে শিক্ষা • পটিয়া ভূমি অফিসে নথি বাণিজ্য ও ঘুষের অভিযোগ, দুদকের তদন্ত দাবি • বান্দরবান-চট্টগ্রামে কাঠ পাচারের অভিযোগ, বন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে লাখ লাখ টাকা ঘুষের দাবি
মতামত সৌদি আরব: পৃথিবীর নিকৃষ্টতম বর্বর দেশ

সৌদি আরব: পৃথিবীর নিকৃষ্টতম বর্বর দেশ

ড. মোহাম্মদ আমীন

পৃথিবীর নিকৃষ্টতম দেশ কোনটি? সৌদি আরব। বর্বর দেশ কোনটি? তাও সৌদি আরব। এটি এমন একটি দেশ, যা এখনো মধ্যযুগীয় বর্বরতায় চলে। এমন কোনো অপরাধ নেই, যা এদেশে হয় না। স্বার্থের জন্য সৌদি রাজতন্ত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পদানত, ইসরাইলের দাসানুদাসে পরিণত একটি জঙ্গল। যেখানে সত্যিকার অর্থে কোনো মানুষ নেই। আমেরিকা-ইসরাইলের আজ্ঞাবহ সৌদি আরব কেন পৃথিবীর সর্বনিকৃষ্ট বর্বর দেশ তার কয়েকটি কারণ নিচে উল্লেখ করা হলো:

১, ধর্মের আড়ালের অধর্ম: সৌদি আরব পৃথিবীর এমন একটি দেশ, যে দেশের সরকার প্রতিনিয়ত ধর্মের আড়ালে অধর্ম করে থাকে। তারা ক্ষমতা, উপভোগ ও যৌনতা ছাড়া কিছু বুঝে না। এখানে  কোনো আইন নেই। জঙ্গলের মতো পাশবিক ব্যবস্থা সর্বত্র। ধর্ম ও শরিয়াহকে রাজতন্ত্রের অবৈধ কর্মকাণ্ডকে বৈধত দানের জন ব্যবহার করা হয়। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৪শে সেপ্টেম্বর মিনায় জামারাত ব্রিজের কাছে শয়তানকে পাথর ছুড়তে যাওয়ার সময় ২৫০০-এর অধিক হাজি পদপিষ্ট হয়ে মারা যান।  সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর গাড়ি বহরের জন্য সড়ক খালি করতে গিয়ে লাখ লাখ হাজিদের হুড়োহুড়ির কারণে এ ঘটনা ঘটে। বিশ্বব্যাপী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দায়ী করে সমালোচনা শুরু হলে, সৌদি গ্র্যান্ড মুফতি ফতোয়া দিলেন, “হায়াত-মউত আল্লাহর হাতে। এটি আল্লাহর হুকুমে হয়েছে।” এমন জঘন্য ধর্মীয়রীতি আর কোথাও নেই।

২, জনসম্মুখে শিরশ্ছেদ: সৌদি আরবে শাস্তি হিসেবে জনসম্মুখে তলোয়ার দিয়ে শিরশ্ছেদ-সহ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, যা আধুনিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।  যে অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় তার চেয়ে অনেক বেশি অপরাধ করলেও সৌদি রাজ পরিবারের কাউকে কোনো শাস্তি দেওয়া হয় না। ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে সৌদি আরবে ৩৫৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তন্মধ্যে কারও বৈচারিক প্রক্রিয়ার আইনগত স্বচ্ছতা ছিল না। ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে অক্টোবর পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে ১৫০ জনের।

৩. গণহারে মৃত্যুদণ্ড: সৌদি আরবে প্রায়শ গণহারে  মৃতদণ্ড প্রদান করা হয়।  মানুষ হয়ে মানুষের ওপর এমন জঘন্য অবিচার পৃথিবীর আর কোনো দেশে করা হয় না।  ২০২২ খ্রিষ্টাব্দে এক দিনে ৮১ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল, যা আধুনিক বিচারব্যবস্থায় অত্যন্ত নিষ্ঠুর একটি নজির হিসেবে সমালোচিত হয়।

৪. নাবালকদের মৃত্যুদণ্ড: আন্তর্জাতিক মহলের ব্যাপক চাপের মুখে দেশটি অপ্রাপ্তবয়স্ক বা নাবালকদের অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড বাতিলের ঘোষণা দিলেও, মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি অনুযায়ী এখনও অনেক ক্ষেত্রে শিয়া সম্প্রদায়ের তরুণদের নাবালক বয়সের রাজনৈতিক অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

৫. গরিব প্রবাসীদের মৃত্যুদণ্ড: সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন বিদেশি অভিবাসী এবং দরিদ্র প্রবাসী শ্রমিকরা। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা Amnesty International এবং Human Rights Watch (HRW)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অমারাত্মক অপরাধেও  যাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়  তাদের প্রায় সবাই বিদেশি বিশেষত দরিদ্র প্রবাসী নাগরিক। জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়, ভাষা ও আইনি সহয়তার অভাব, কূটৈনৈতিক দুর্বলতা প্রভৃতি বিদেশি নাগরিকদের মৃতুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার প্রধান কারণ। এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকতে রয়েছে, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিশর, ইথিওপিয়া, বাংলাদেশ, সোমালিয়া, জর্ডান, সিরিয়া, সুদান, আফগানিস্তান এবং নাইজেরিয়া। সৌদি আরবে প্রতিবছর ২০০ জনেরও বেশি গরিব বিদেশি নাগরিককে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়, যা দেশটির মোট মৃত্যুদণ্ডের একটি বিশাল অংশ। ২০২৫ সালে দেশটিতে মোট ৩৫৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, যার মধ্যে ১৮৮ জনই ছিলেন বিদেশি নাগরিক। যে অপরাধের জন্য গরিব দেশের নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, সে অপরাধে সৌদি নাগারিকদের কোনো শাস্তিই দেওয়া হয় না। আমিরকার মতো প্রভাশালী রাষ্ট্রের নাগরিকদের সে দেশে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। 

৬. মহিলা গৃহকর্মী নির্যাতন: সৌদ আরবের নাগরিকগণ বাংলাদেশসহ অনুন্নত মুসলিম রাষ্ট্রসমূহ থেকে মহিলা গৃহীকর্মী নিয়ে তাদের ওপর নির্বিচার যৌনাচার করে। নির্যাতন এমন পর্যায়ে যায় যে, অনেকে মৃত্যুবরণ করে। সব দেশ মিলিয়ে সৌদি আরবে প্রতিবছর আনুমানিক ৫০০ বিদেশি নারী গৃহকর্মী মারা যান, যাদের একটি বড়ো অংশের মৃত্যুর পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নির্যাতন জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।  বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের (BRAC) মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম এবং প্রবাসী কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বিগত ৭-৮ বছরে বিদেশ থেকে প্রায় ৮০০ জনেরও বেশি বাংলাদেশি নারী শ্রমিকের মরদেহ দেশে এসেছে, যার সিংহভাগই এসেছে সৌদি আরব থেকে。 অর্থাৎ, প্রতি বছর গড়ে ১০০ থেকে ১২০ জন বাংলাদেশি নারী কর্মী সৌদি আরবে মারা যান। যাদের ৯৭ ভাগই যৌন নিপীড়ন ও দৈহিক নির্যাতনের শিকার। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন দেশের কনস্যুলার রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশ ছাড়াও ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও আফ্রিকার বিভিন্ন  দেশের নারীরাও প্রতিনিয়ত সেখানে জোরপূর্বক শ্রম, শারীরিক নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের শিকার হন। এই দেশগুলো থেকেও প্রতিবছর বহু সংখ্যক নারীর রহস্যজনক মৃত্যুর খবর আসে, কিন্তু  সরকার সঠিক তথ্য প্রকাশ করে না।

৭. যৌন অপরাধ: সৌদি আরবের মতো যৌন অপরাধ, ধর্ষণ ও বলাৎকার পৃথিবীর আর কোনো দেশে হয় না। এগুলো করে সৌদিরা, বিশেষ করে সৌদি রাজপরিবারের সদস্যবর্গ। গরিব দেশের কেউ সামান্য অপরাধ করলেও বিনা বিচারে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। অথচ, এমন কোনো যৌন অপরাধ নেই, যা সৌদি রাজপরিবারের সদ্যস্যবর্গ করে না, অথচ এজন্য তাদের কোনো বিচারের মুখোমুখি হতে হয় না। সৌদি আরব থেকে ফিরে আসা অনেক নারী কর্মী তাদের ওপর পরিচালিত যৌন নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন। ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে বিবিসি ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সুমি আক্তার ও আমেনা বেগমের মতো নারীদের আকুতি ছড়িয়ে পড়েছিল। যেখানে তারা জানান, যৌন প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তাদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হয় এবং কাউকে কাউকে ‘যৌন দাসী’ হিসেবে অন্যের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল।

৮. রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা: সৌদি আরবে কোনো গণতান্ত্রিক নির্বাচন বা সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক অধিকার নেই; এটি নিরঙ্কুশ ইসলামি রাজতন্ত্রের অধীনে পরিচালিত একটি পাশব রাষ্ট্র।  তাদের ইসলাম, মুহাম্মদের ইসলাম নয়; সৌদি রাজ পরিবারকে নিরাপদ রাখার ইসলাম। ইসলাম দিয়ে তারা অপছন্দের নিরীহ অসহায়দের ওপর চরম অত্যাচার চালায়। 

 ৯. মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা: সৌদি আরবে সরকারের সমালোচনা, ভিন্নমত পোষণ বা রাজনৈতিক দলের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অনেক সময় ভিন্নমতাবলম্বী লেখক, সাংবাদিক বা সক্রিয় কর্মীদের   কারাদণ্ড বা নিপীড়নের শিকার হতে হয়। রাজ পরিবারের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ন্যূনতম সমালোচনা করলেও তাকে শেষ করে দেওয়া হয়। এই দেশে কোনো বাক্‌স্বাধীনতা নেই। তবে, আমেরিকা-ইসরাইল কিংবা যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের জন্য রয়েছে অবারিত স্বাধীনতা। 
নারী অধিকার ও অভিভাবকত্ব প্রথা: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারীদের গাড়ি চালানোর অধিকার, একা ভ্রমণ এবং কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো হলেও, প্রকৃতপক্ষে ওই দেশে নারীদের কোনো অধিকার নেই। তাদের আপাদমস্তক কালো বোরকায় ঢেকে বের হতে হয়। তবে মার্কিন মহিলা নাগরিকগণ ইচ্ছেমতো চলাফেলা করতে পারে।

১০. নারীদের পারিবারিক অধিকারের সীমাবদ্ধতা: ২০২২ খ্রিষ্টাব্দে কার্যকর হওয়া সৌদি ব্যক্তিগত মর্যাদা আইন (Personal Status Law)-এ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হলেও, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, এটি এখনও বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ এবং সন্তানের অভিভাবকত্বের ক্ষেত্রে নারীর ওপর পুরুষের আধিপত্য বজায় রেখেছে। সৌদি আইনে, নারীদের ওপর, পুরুষের একচ্ছত্র আধপত্য এতই প্রবল যে, সৌদি নারীকে পুরুষের যৌনদাসী ছাড়া আর কিছু ভাবা যায় না।

১১. সাংস্কৃতিক পরিবেশ ও ঐতিহ্য ধ্বংস: সৌদি আরবে 'ভিশন ২০৩০'- এর অধীনে বিনোদন সেক্টর উন্মুক্ত করার উদ্দেশ্যে অনেক প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা ভেঙে আধুনিক বিনোদন কেন্দ্র ও কনসার্ট ভেন্যু তৈরি করা হয়েছে, যা স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী ও ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর অনুভূতির ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত হিসেবে সমালোচিত।
 
১২. প্রবাসী শ্রমিকদের শোষণ: সৌদি আরবে কর্মরত ও গরিব দেশ হতে আগত স্বল্প আয়ের প্রত্যেক অভিবাসী শ্রমিক কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার। বিশেষ করে গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতন চরম পাশবতার ঘৃণ্য নজির। শারীরিক ও যৌন নির্যাতন, সময়মতো বেতন না দেওয়া এবং 'কাফালা' (Kafala) পদ্ধতির কারণে আইনি সীমাবদ্ধতার বিষয়টি বিভিন্ন সময় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। পৃথিবীর আর কোনো দেশে প্রবাসী শ্রমিকদের এমন শোষণ ও নির্যাতন করা হয় না। মাসের পর মাস বেতন না পেয়ে অনেক শ্রমিক ক্যাম্পে মানবেতর জীবনযাপন করেন। প্রতিবাদ করলে বা কফিলের নামে অভিযোগ করলে উল্টো চুরির মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।

১৩. ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপ: কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া কেবল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি জোট সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। এই অভিযানের কারণে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সৌদি সরকার হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে মারাত্মক নৃশংস আচরণ শুরু করে। যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

১৪. ইয়েমেন সীমান্তে অভিবাসীদের ওপর গুলি:  আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা 'হিউম্যান রাইটস ওয়াচ'-এর একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে যে, সৌদি সীমান্তরক্ষী বাহিনী ইয়েমেন সীমান্ত পার হয়ে সৌদি আরবে ঢোকার চেষ্টা করা শত শত আফ্রিকান অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীকে লক্ষ্য করে দূর থেকে ভারী অস্ত্র দিয়ে গুলি চালিয়েছে, যা একটি বড় ধরনের যুদ্ধাপরাধের তুল্য।

১৫. কঠোর শারীরিক শাস্তি ও বেত্রাঘাত: চুরির অপরাধে হস্তকর্তন এবং বিভিন্ন আইনি বা সামাজিক অপরাধের জন্য চাবুক মারা বা বেত্রাঘাতের (Flogging) মতো মধ্যযুগীর শাস্তির নির্মম  বিধান সৌদি আরবকে পৃথিবীর  বর্বরতম দেশে পরিণত করে। যদিও ২০২০ সালে সৌদি সুপ্রিম কোর্ট বেত্রাঘাতের শাস্তি বহুলাংশে বাতিলের ঘোষণা দেয়, তবুও তাদের বিচারব্যবস্থায় এখনও বেশ কিছু শারীরিক শাস্তির বিধান বহাল আছে। এসব বৈচারিক নির্মমতা অধিকাংশ ক্ষেত্রে গরিব দেশসমূহ হতে আগত প্রবাসীদের ওপর প্রযোজ্য হয়।

১৬. ধর্মীয় স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা: শুধু রাজনৈতিক নয়, সৌদি আরবে মানুষের কোনো ধর্মীয় স্বাধীনতাও নেই। ইসলাম, দেশটির রাষ্ট্রীয় ধর্ম এবং আইন ব্যবস্থার মূল ভিত্তি শরিয়াহ আইন। এই শরিয়াহ আইন আবার শাসকদের সুবিধা অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়।  এটি এমন একটি দেশ, যেখানে প্রকাশ্যে অন্য কোনো ধর্মচর্চা করা, উপাসনালয় (যেমন- গির্জা বা মন্দির) নির্মাণ করা বা ইসলামের সমালোচনা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। এজন্য বিশ্বব্যাপী দেশটি একটি পশুরাজ্য নামে পরিচিত।

১৭. বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার অভাব: সৌদি আরবের আদালতগুলোতে প্রায়শ আসামিরা পর্যাপ্ত আইনি সহায়তা বা আইনজীবী পাওয়ার সুযোগ পান না। গোপন বিচারকার্য এবং জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া হয়। বিশেষ করে অনুন্নত রাষ্ট্রসমূহ হতে আগত প্রবাসীদের বিচার প্রক্রিয়া ন্যূনতম স্বচ্ছতাও রক্ষিত হয় না।  ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই অক্টোবার দুই বাংলাদেশিকে কেবল চুমো খাওয়া অপরাধে কোনে রূপ স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়া ছাড়া বাংলাদেশকে না জানিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সৌদি আরব সভ্য দেশ হলে এমনটি করত না।

১৮. বিদেশে ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর নজরদারি ও দমন: শুধু দেশের ভেতরেই নয়, দেশের বাইরে থাকা সমালোচক বা অ্যাক্টিভিস্টদের ওপরও সৌদি সরকার কাঠোর ও অমানবিক নজরদারি করে। ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দে ইস্তাম্বুলের সৌদি কনসুলেটে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সৌদি আরবের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে নিকৃষ্টতার তলানিতে নিয়ে যায়।

১৯. ধর্মীয় পুলিশের (মুতাওয়া) আচরণ ও প্রভাব: অতীতে 'হিজবাহ' বা ধর্মীয় পুলিশ সাধারণ মানুষের পোশাক, চলাফেরা এবং প্রার্থনার সময় দোকানপাট বন্ধ রাখার বিষয়ে রাস্তায় অত্যন্ত কঠোরতা দেখাত। বর্তমানে তাদের ক্ষমতা সীমিত করা হলেও সামাজিক রক্ষণশীলতা এবং পরোক্ষ নজরদারি পুরোপুরি চলে যায়নি। ধর্মের নামে তারা মানুষের ওপর পশুর মতো নৃশংস আচরণ  করে। অথচ নিজেরা আড়ালে অবৈধ যৌনাচারসহ যাবতীয় অধর্মের কাজ করে।

২০. আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ: সৌদি আরবের আধুনিক মেগাপ্রজেক্ট  'নিওম' (NEOM) এবং 'দ্য লাইন' (The Line) শহর নির্মাণের জন্য স্থানীয় 'হুয়াইতাত' (Howeitat) উপজাতির মানুষকে তাদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয়। এর বিরোধিতা করায় অনেককে হত্যা করা হয়।

২১. রাজনৈতিক বন্দিদের অবহেলা ও নির্যাতন: পৃথিবীর প্রত্যেক দেশে কারাগারে আটক বন্দিদের কমবেশি চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু, সৌদি আরবের কারাগারে আটক রাজনৈতিক বন্দি এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের সঠিক চিকিৎসা না দেওয়া, নির্জন কারাবাসে রাখা এবং মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায় অতি স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এ দেশে কারাবন্দিদের যে দুঃসহ অবস্থায় রাখা হয়, পৃথিবীর আর কোনো দেশে এমনটি করা হয় না।

২২. সন্ত্রাসবিরোধী আইনের  অপব্যবহার: সৌদি আরবে, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। পান থেকে চুন খসলেও চরম শাস্তি ভোগ করতে হয়, অথচ যারা শাস্তি দেয় তাদের সাতখুন মাফ। অহিংস রাজনৈতিক কর্মী, মানবাধিকার আইনজীবী এবং সমাজ সংস্কারকদের এই আইনের আওতায় এনে 'সন্ত্রাসী' তকমা দিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের  বিনা বিচারে বা অস্বচ্ছ বিচারের মাধ্যমে হত্যা করা হয় বা নির্বাসিত করা হয়।

২৩. সংখ্যালঘুদের ওপর বৈষম্য: সুন্নি অধ্যুষিত সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে বসবাসরত শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলমানরা রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, বিচার-ব্যবস্থা এবং সরকারি চাকুরির ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত বৈষম্য ও অবহেলার শিকার হন। ন্যায় বিচারের অজুহাতে তাদের সীমাহীন অবিচার ও নির্যাতন করা হয়।

২৪. রাজনৈতিক দল ও শ্রমিক ইউনিয়ন নিষিদ্ধকরণ: সৌদি আরবে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক দল গঠন, ট্রেড ইউনিয়ন বা শ্রমিক ইউনিয়ন তৈরি করা এবং কর্মক্ষেত্রে অধিকার আদায়ের জন্য ধর্মঘট বা আন্দোলন করা সম্পূর্ণ বেআইনি। ফলে সাধারণ নাগরিক ও শ্রমিকদের নিজেদের অধিকারের পক্ষে সংগঠিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কেউ যদি তাদের অধিকার আদায়ের চেষ্টা করা হয় তবে তাদের কারাবন্দি করা হয়।

২৫. আইনসভা ও জবাবদিহির অনুপস্থিতি: দেশটিতে কোনো নির্বাচিত সংসদ বা আইনসভা নেই। 'মজলিস আশ-শুরা' নামের একটি পরামর্শক সভা থাকলেও তার সদস্যদের সবাই রাজ কর্তৃক  নিয়োগপ্রাপ্ত। তাই তারা রাজা যা বলেন তই করেন।  রাজার ডিক্রি বা আদেশই সেখানে চূড়ান্ত আইন। যার ওপর সাধারণ জনগণের কোনো নিয়ন্ত্রণ বা জবাবদিহি চাওয়ার অধিকার নেই।

২৬. গুম ও যোগাযোগহীন রাখা (Incommunicado Detention): সৌদি আরবে অনেক সময় রাজনৈতিক কর্মী, অ্যাক্টিভিস্ট বা সমালোচকদের গ্রেপ্তারের পর মাসের পর মাস সম্পূর্ণ গোপন রেখে দেওয়া হয়। তাদের কোথায় রাখা হয়েছে বা কী অবস্থায় আছেন, তা পরিবারের সদস্য বা আইনজীবীদের জানতে দেওয়া হয় না, যা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।

২৭. বিচারকদের সীমাহীন ব্যক্তিগত ক্ষমতা: সৌদি আরবের বিচার ব্যবস্থায় অনেক সময় অপরাধের সুনির্দিষ্ট বা লিখিত কোড বা ধারা থাকে না। শরিয়াহ আইনের নিজস্ব ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে একজন বিচারক (কাজী) তার নিজের ইচ্ছামতো যে-কোনো শাস্তির রায় দিতে পারেন, যার ফলে বিচার প্রক্রিয়ায় চরম অসংগতি ও পক্ষপাতিত্ব দেখা যায়। বিচার ব্যবস্থার এমন বর্বরতা পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না।

২৮. কারাগারে আত্মহত্যা: সৌদি আরবের হাই-সিকিউরিটি কারাগারগুলোয় অনেক সময় হাই-প্রোফাইল রাজনৈতিক বন্দি বা মানবাধিকার কর্মীদের রহস্যজনক মৃত্যুর খবর আসে, যেগুলোকে পরবর্তীকালে 'আত্মহত্যা' বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। এসব ঘটনার কোনো স্বাধীন বা আন্তর্জাতিক তদন্তের সুযোগ দেওয়া হয় না।

২৯. শ্রমিকদের পাসপোর্ট জব্দ ও বন্দিদশা: কাফালা আইনের কিছু সংস্কারের কথা বলা হলেও, বাস্তবে এখনও বহু নিয়োগকর্তা (কফিল) এশিয়ান ও আফ্রিকান অভিবাসী গরিব শ্রমিকদের পাসপোর্ট নিজেদের জিম্মায় রেখে দেন। এর ফলে শ্রমিকরা চাইলেও কাজ পরিবর্তন করতে পারেন না বা দেশে ফিরে আসতে পারেন না, যা আধুনিক দাসত্বের (Modern Slavery) শামিল। এই আইন এত অমানবিক যে, ওই দেশে গিয়ে একজন প্রবাসী কফিলের কাছে গৃহপালিত পশু হয়ে যায়।  অনেক কফিল (নিয়োগকর্তা) শ্রমিকদের পাসপোর্ট কেড়ে নেয় এবং আইনিভাবে থাকার পারমিট বা ‘আকামা’ নবায়ন করে না。 এর ফলে বৈধভাবে গিয়েও হাজার হাজার বাংলাদেশি রাতারাতি ‘অবৈধ’ হয়ে যান এবং পুলিশের তাড়া খেয়ে পালিয়ে বেড়ান।

৩০. বিচারিক আদালতের অপব্যবহার: দেশটিতে ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনের জন্য একটি বিশেষ আদালত (Specialized Criminal Court - SCC) রয়েছে, যা সন্ত্রাসবাদের বিচারের জন্য তৈরি হয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, এই আদালতটিকে এখন মূলত লেখক ও অ্যাক্টিভিস্টদের কঠোর শাস্তি দেওয়ার রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এর কোনো প্রতিকারের ব্যবস্থা নেই। 

৩১. সমাজ সংস্কারক নেত্রীদের ওপর দমনপীড়ন: সম্প্রতি সৌদি আরবে নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু লুজাইন আল-হাথলুল-সহ যেসকল নারীবাদী নেত্রী এই অধিকার আদায়ের জন্য বছরের পর বছর আন্দোলন করেছিলেন, তাদের গাড়ি চালানোর অনুমতি দেওয়ার ঠিক আগেই গ্রেপ্তার করা হয় এবং কারাগারে দীর্ঘ সময় নির্যাতন করা হয়, যাতে এই সংস্কারের কৃতিত্ব কোনো নাগরিক আন্দোলনের কাছে না গিয়ে সম্পূর্ণ রাজপরিবারের কাছে থাকে।

৩২. আশ্রয়প্রার্থী ও শরণার্থীদের অধিকারহীনতা: সৌদি আরব ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দের আন্তর্জাতিক শরণার্থী কনভেনশনে স্বাক্ষর করেনি। এর ফলে দেশটিতে কোনো স্বীকৃত রাজনৈতিক বা মানবিক আশ্রয় পাওয়ার আইনি ব্যবস্থা নেই। সেখানে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে আসা শরণার্থীদেরও সাধারণ অবৈধ অভিবাসী হিসেবে গণ্য করা হয় এবং যেকোনো সময় বহিষ্কার করা হতে পারে।

৩৩. পাঠ্যপুস্তকে উগ্রবাদ ও পরমতসহিষ্ণুতার অভাব: সৌদি আরবের জাতীয় শিক্ষা পাঠ্যসূচিতে এখনও এমন কিছু উপাদান রয়ে গেছে যা অন্য ধর্মাবলম্বী, শিয়া সম্প্রদায় কিংবা অমুসলিমদের প্রতি পরোক্ষ বিদ্বেষ বা অসহিষ্ণুতা ছড়ায়। এসব পাঠ্যপুস্তক ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টির জন্যই যেন লিখিত। তাই সৌদি আরব বৈশ্বিক বিবেচনায় একটি বর্বর দেশ হিসেবে পরিচিত।

৩৪. রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠী (Bidoon): সৌদি আরবে 'বিদুন' বা এমন একটি বিশাল জনগোষ্ঠী রয়েছে যারা বংশপরম্পরায় দেশটিতে বসবাস করলেও কোনো নাগরিকত্ব বা বৈধ কাগজপত্র পায়নি। এর ফলে তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, চাকুরির অধিকার এবং আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকে। তাদের সৌদি আরবের নাগরিক গণ্য করা হয় না। তাদের কোনো রাষ্ট্র নেই, অধিকার নেই।

৩৫. ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং পরিবারের ওপর প্রতিশোধ: সৌদি আরবে সাজা খেটে বা কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পরও রাজনৈতিক বন্দি ও সমাজ সংস্কারকদের বছরের পর বছর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা (Travel Ban) দিয়ে রাখা হয়। এমনকি সরকার বিরোধীদের শাস্তি দিতে তাদের নিরীহ পরিবারের সদস্যদেরও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে তাদের আত্মীয়স্বজনকেও চরমমাত্রায় হয়রানি করা হয় নানাভাবে।

৩৬. শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদও নিষিদ্ধ: সৌদি আরব এমন একটি বর্বর দেশ, যেখানে যেকোনো ধরনের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ, জনসমক্ষে বিক্ষোভ বা রাজপথে প্রতিবাদ করা সম্পূর্ণ অবৈধ। কেউ যদি কোনো নাগরিক বা সামাজিক অধিকারের দাবিতে দলবদ্ধ হয়ে রাস্তায় নামেন, তবে তাকে সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে গ্রেপ্তার করা হয়। শুধু তাই নয়, অন্য কোনো দেশের নাগরিকগণ যদি তাদের দেশের বিষয়ে কোনো শান্তিপূর্ণ  সমাবেশ করে থাকেন তাহলে তাদেরও গ্রেফতার করা হয়। বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব চলাকালীন বিপ্লবের পক্ষে রাস্তায় নেমে আসা সৌদি প্রবাসীদের গ্রেফতার করা হয়েছিল।

৩৭. পারিবারিক সহিংসতা ও আইনি সুরক্ষার অভাব: সৌদি আরবে সমাজ ও বিচার ব্যবস্থার গভীর রক্ষণশীলতার কারণে কোনো নারী পারিবারিক নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হলে পুরুষ অভিভাবকদের ভয়ে পুলিশের কাছে বা আইনি আশ্রয় নিতে পারেন না। এখানে মানুষ হিসেবে নারীদের অধিকার ও মর্যাদা পুরুষের তুলনা অনেক কম।

৩৮. সংখ্যালঘু ধর্মীয় স্থাপনার ওপর কড়াকড়ি: সৌদি আরবে শিয়া মুসলিমদের ওপর পদ্ধতিগত বৈষম্যের পাশাপাশি তাদের ধর্মীয় উপাসনালয় (হুসাইনিয়া) বা মাদ্রাসা নির্মাণের ক্ষেত্রে কঠোর প্রশাসনিক বাধা ও নজরদারি রয়েছে, যা সুন্নিদের তুলনায় প্রচণ্ডভাবে বৈষম্যমূলক।

৩৯. মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের আড়ালে কারাগার: আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রিপোর্টের অভিযোগ অনুযায়ী, সৌদি আরবে কোনো কোনো ভিন্নমতাবলম্বী বা অবাধ্য নারীকে অপরাধী হিসেবে সাজা না দিয়ে, পারিবারিকভাবে বা সরকারি নির্দেশে জোরপূর্বক মানসিক হাসপাতালে দীর্ঘদিনের জন্য আটকে রাখা হয়, যেখানে তাদের আইনি লড়াইয়ের কোনো সুযোগ থাকে না।

৪০. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কঠোর নজরদারি: সরকারের নীতি বা রাজপরিবারের সমালোচনা করে টুইট (X) করা, কোনো পোস্ট শেয়ার করা বা সাধারণ কোনো মন্তব্য করার কারণেও সাধারণ নাগরিকদের কয়েক দশক পর্যন্ত দীর্ঘ কারাদণ্ডের সাজা দেওয়ার নজির রয়েছে।

৪১. বিদেশে অর্থায়নের মাধ্যমে মৌলবাদ প্রচারের অভিযোগ: সৌদি আরব বিগত কয়েক দশকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে কট্টর ও রক্ষণশীল ওয়াহাবি মতাদর্শের মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণ করেছে, যা পরোক্ষভাবে বৈশ্বিক ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও উগ্রবাদ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে এবং রাখছে। বাংলাদেশে এভাবে প্রতিষ্ঠিত অনেক মাদ্রাসা এখন জঙ্গি-জিহাদি এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারখানা।

৪২. প্রযুক্তির অপব্যবহার: সৌদি আরব, পেগাসাস-সহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন স্পাইওয়্যার এবং আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি কিনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা সৌদি নাগরিক, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের ব্যক্তিগত ফোন ও ডিভাইসে হ্যাকিং করে থাকে। 

৪৩.  সামাজিক মাধ্যমে অনুপ্রবেশের অভিযোগ: আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে উইকিপিডিয়ার মতো উন্মুক্ত তথ্যকোষের ভেতরে নিজেদের গোপন এজেন্ট বা ইনফিল্ট্রেটর ঢুকিয়ে তথ্য পরিবর্তন করার এবং ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আছে। এছাড়া অতীতে টুইটার (X) এর ভেতরের কর্মীদের অর্থ দিয়ে ভিন্নমতাবলম্বীদের তথ্য চুরি করার অভিযোগেও মার্কিন আদালতে বিচার হয়েছে। সৌদি আইনে, চৌর্যবৃত্তি অপরাধ হলেও সৌদি সরকার নানাভাবে অহরহ চুরির সঙ্গে জড়িত।

৪৪. ডিটেনশন ক্যাম্প: করোনা মহামারী ও তার পরবর্তী সময়ে আফ্রিকার (বিশেষ করে ইথিওপিয়ান) অভিবাসী শ্রমিকদের অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ও গাদাগাদি করে ডিটেনশন সেন্টারে আটকে রাখা হয়েছিল, যেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বা খাদ্যের অভাব ছিল। ফলে, প্রচুর আফিকান মারা যায়।

৪৫. ভ্রাতৃত্ববোধহীনতা: সৌদি আরব এমন একটি পাশব দেশ, যে দেশের সরকার ও জনগণের ন্যূনতম ভ্রাতৃতবোধ নেই। স্ব-সম্প্রদায়ের লোকের প্রতি কোনো সহানুভূতি নেই; আছে বরং বিরক্তি। অন্যদেশের মুসলিম অভিবাসীদের মনে করে মিসিকিন, দেখে ঘৃণার চোখে। মুসিলম ছাড়া অন্য ধর্মাবলম্বীদের মনে মনিব। অথচ এরা একসময় বাংলাদেশে এসে ভিক্ষা করত।

৪৬. রাষ্ট্রীয় তহবিলের মাধ্যমে 'স্পোর্টসওয়াশিং' (Sportswashing): সৌদি আরব তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বৈশ্বিক ইমেজ ও ভাবমূর্তি লুকাতে এবং বিশ্ববাসীর দৃষ্টি ভিন্ন খাতে ঘোরাতে শত শত কোটি ডলার খরচ করে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো বড়ো তারকাদের ফুটবল লিগে আনছে, গলফ টুর্নামেন্ট বা ডাব্লিউডাব্লিউই (WWE) ইভেন্ট আয়োজন করছে; এবং ২০৩৪ সালের ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের অধিকার কিনেছে।

৪৭.  বাংলাদেশি শ্রমিকদের ওপর অত্যাচার: সৌদি আরবে বাংলাদেশি শ্রমিকদের—বিশেষ করে সাধারণ পুরুষ কর্মী ও নারী গৃহকর্মীদের—দুরবস্থার কাহিনি অত্যন্ত বেদনাবিদায়ক ও অমানবিক। প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে ধারদেনা বা জমি বিক্রি করে সৌদি আরব যান, কিন্তু অনেকের ভাগ্যেই জোটে সীমাহীন প্রতারণা ও নির্যাতন। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, ব্র্যাকের (BRAC) মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম এবং ফিরে আসা শ্রমিকদের ভাষ্য থেকে এই ট্র্যাজেডির মূল চিত্রগুলো উঠে।

৪৮. উচ্চম্মন্যতা:  মুসলমানের কাছে অতি পবিত্র বলে বিবেচিত মক্কা ও মদীনা সৌদ আরবে অবস্থিত। বিশ্ব মুসলিমের এ দুটির প্রতি অতি  আকর্ষণের সুবাদে সৌদি আরব বিশ্বের অন্যান্য দেশের মুসলিমদের মারাত্মক অবহেলার চোখে দেখে। মনে করে, তারা ছাড়া বাকি সব মুসলিম তুচ্ছাতিতুচ্ছ তৃণ। অথচ, অ্যামেরিকা, ইসরাইল, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, চীন-সহ অন্যান্য দেশের অমুসলিমদের মনে করে দেবতা। অ্যামেরিকা আর ইসরাইলকে মনে করে রক্ষক। 

উপসংহার: মানবাধিকার, বাক্‌স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা, বিচারব্যবস্থা, আর্থসামাজিক প্রবাহ, সাম্য, নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ প্রভৃতি বিবেচনায় সৌদি আরব পৃথিবীর নিকৃষ্টতম একটি দেশ।  এমন কোনো অপরাধ নেই, যা সৌদি সরকার করে না। রাজতন্ত্রের সুবিধার জন্য তারা যা ইচ্ছে তা করতে পারে। যার কারণে, দেশটি ইসরাইল-আমেরিকার মতো দেশের কাছে নতজানু হয়ে তাদের সব আদেশ ঈশ্বরাজ্ঞার মতো মেনে নিতে দ্বিধা করে না। ক্ষমতা টিকিয়ে রেখে লালসা চরিতার্থ করার জন্য ইসরাইল-আমেরিকাকে প্রভু হিসেবে মেনে নিয়েছে।  আপনি কিছু দিন অ্যামেরিকায় থাকলে নাগরিক্ত পাবেন, কিন্তু সৌদি আরবে হাজার বছর থাকলেও পাবেন না।  এমন নৃশংস, বর্বর  ও জঘন্য দেশ পৃথিবীতে আর নেই।

খুঁজুন