রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
সহকর্মী বেচে থাকতেই তাঁর দুঃসময়ে পাশে দাঁড়াতে শিখি • রিসোর্টের ট্র্যাজেডি আমাদের কী শেখায় • নজরুল ও সিতির শিরশ্ছেদ মানবাধিকার ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের লঙ্ঘন • মেসির জোড়া গোলে আটলান্টাকে ৩-১ ব্যবধানে হারাল ইন্টার মায়ামি • জুনে সতর্কবার্তা, অক্টোবরে দশ মৃত্যু: টুপটুপ রিসোর্টের আগুন থেকে শিক্ষা • পটিয়া ভূমি অফিসে নথি বাণিজ্য ও ঘুষের অভিযোগ, দুদকের তদন্ত দাবি • বান্দরবান-চট্টগ্রামে কাঠ পাচারের অভিযোগ, বন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে লাখ লাখ টাকা ঘুষের দাবি • আমি জ্ঞানের শহর, আলী তার দরজা • ওষুধের আগুন, রাষ্ট্রের পরীক্ষা: হ্যাজম্যাট প্রস্তুতি ও জবাবদিহি কোথায়? • গজারিয়ায় ফুলদী নদীতে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ, কাজ শুরু এ বছরই
মতামত সহকর্মী বেচে থাকতেই তাঁর দুঃসময়ে পাশে দাঁড়াতে শিখি

সহকর্মী বেচে থাকতেই তাঁর দুঃসময়ে পাশে দাঁড়াতে শিখি

প্রয়াত সাংবাদিক পুলক দার সহধর্মিনীর সঙ্গে কিছুক্ষণ আগে কথা হলো। বরিশালের ব্যবসায়ী গণেশ দার মাধ্যমে। পূজা উপলক্ষে কিছু উপহার নিয়ে তিনি পুলক দার বাসায় গিয়েছিলেন। সেখান থেকেই আমাকে ফোনে ধরিয়ে দিলেন বৌদির সঙ্গে কথা বলার জন্য।

ফোনের ওপাশ থেকে বৌদির কান্না শুনে বুকটা কেঁপে উঠল। তাকে সান্ত্বনা দিলাম, সহমর্মিতা জানালাম। কিন্তু মুখ থেকে আর বেশি কিছু বের হলো না। কী-ইবা বলার আছে! কিছু কষ্টের সামনে সব শব্দ যেন অসহায় হয়ে যায়। ফোন রাখার পরও বৌদির কান্না কানে বাজছে। বুকের ভেতরটা এখনও থরথর করছে।

ফোন রাখার আগে গণেশ দার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা হলো। তিনি যে অভিজ্ঞতার কথা বললেন, তা আরও বেশি ভারাক্রান্ত করেছে মনকে।

গণেশ দা বললেন, বাসায় গিয়ে দেখেন, মেয়েটি কিছু খায়নি। বৌদি এক কোণে বসে কাঁদছেন। মেয়েটির মুখের দিকে তিনি তাকাতেও পারছিলেন না। একজন স্বজনহারা পরিবারের এমন অসহায় দৃশ্য তাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছে।

কথা প্রসঙ্গে গণেশ দা আরও বললেন, ভূমি অফিসের একজন পিয়নও কত কাড়ি কাড়ি টাকার মালিক বনে যান। অথচ একটি বিভাগীয় শহরে দৈনিক সমকালের ব্যুরো প্রধানের দায়িত্ব পালন করেও পুলক দার পরিবারকে আজ এমন মানবেতর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।

একজন সাংবাদিক হিসেবে মানুষের কথা লিখেছেন। মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, অভাব-অভিযোগ, বঞ্চনা আর অসংগতির গল্প তুলে ধরেছেন। সমাজের নানা অসংগতি নিয়ে কলম ধরেছেন। বরিশালের মতো একটি বিভাগীয় শহরে একটি পত্রিকার ব্যুরো প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন। বরিশাল প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন।

অথচ জীবনের শেষ সময়ে এসে নিজের পরিবারের ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তাটুকুও নিশ্চিত করতে পারেননি। এটাই হয়তো তার সততার প্রতিচ্ছবি। 

পুলক দা আমাকে খুব স্নেহ করতেন। একসময় সমকালে কাজ করারও প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘তোমার হাত ভালো। সমকালে চলে আসো।’ তার সেই স্নেহের কথা আজ খুব মনে পড়ছে।

পুলক দার রাঙ্গাবালী ঘুরতে আসার পরিকল্পনাও ছিল। একদিন ফোন করে জানতে চেয়েছিলেন, কীভাবে রাঙ্গাবালী আসবেন। আমিও তাকে বিস্তারিত সব জানিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, দাদাকে নিয়ে সোনারচর ও  চরহেয়ার ঘুরবো। কিন্তু পুলক দার আর রাঙ্গাবালী আসা হলো না। সেই দেখা আর কখনো হবে না।

২০২৩ সালের মে মাসে সমকাল থেকে চাকরি হারানোর পর আর কোনো গণমাধ্যমে নিয়মিত কাজের সুযোগ হয়নি তার। এরপর কেমন করে দিন কেটেছে, কতটা অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে সময় পার করেছেন, তার অনেকটাই হয়তো আড়ালে রয়ে গেছে।

সাংবাদিকদের একটা অদ্ভুত সংকট আছে। পকেটে টাকা না থাকলেও অনেক সময় কাউকে বুঝতে দিতে চান না। অভাবের কথা বলতে পারেন না। কারণ, অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি তাদের বয়ে বেড়াতে হয় সামাজিক মর্যাদা হারানোর ভয়। আত্মসম্মানের জায়গা থেকে অনেকেই নিজের কষ্ট গোপন রাখেন। পুলক দাও হয়তো তেমনই নিজের অভাব আড়াল করে রেখেছিলেন।

চলতি বছরের গত ১১ সেপ্টেম্বর পুলক দা আত্মহত্যা করেন। রেখে যান বৌদি ও তাদের সন্তান। 

আমাদের সমাজে একজন মানুষের আর্থিক সচ্ছলতা, সামাজিক মর্যাদা কিংবা পেশাগত পরিচয়ের মূল্যায়ন কত বিচিত্র! একজন সাংবাদিক সারাজীবন মানুষের জন্য লিখবেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখবেন, মানুষের দুঃখ তুলে ধরবেন। অথচ তার নিজের পরিবার যখন অসহায় হয়ে পড়বে, তখন পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষও খুঁজে পাওয়া যাবে না-এ কেমন বাস্তবতা?

পুলক দার মৃত্যুর পেছনের সব কারণ হয়তো আমরা জানি না। তবে চাকরি হারানোর পর দীর্ঘ বেকারত্ব, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার বিষয়গুলো আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

একজন সাংবাদিকের চাকরি চলে যেতে পারে, কর্মস্থল বদলে যেতে পারে, পেশাগত জীবনে বিপর্যয় আসতে পারে। কিন্তু তার দীর্ঘদিনের শ্রম, অভিজ্ঞতা ও অবদানের কি কোনো মূল্য থাকবে না? তার পরিবার কি একেবারেই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে থাকবে?

আজ বৌদির কান্না শুনেছি। গণেশ দার মুখে শুনেছি একটি পরিবারের অসহায়ত্বের গল্প। আর মনে পড়েছে পুলক দার সেই স্নেহমাখা কথাগুলো-‘তোমার লেখার হাত ভালো। সমকালে চলে আসো।’

কত সহজেই একজন মানুষ আরেকজনকে স্বপ্ন দেখান, উৎসাহ দেন। অথচ সেই মানুষটির নিজের জীবনের শেষ অধ্যায়টি কতটা কষ্টের ছিল, তা হয়তো আমরা অনেকেই বুঝতে পারিনি।

পুলক দা, আপনার সঙ্গে রাঙ্গাবালীতে আর দেখা হবে না। আপনার সেই আসার পরিকল্পনাও আর পূরণ হবে না। কিন্তু আপনার স্নেহ, আপনার কথাগুলো মনে থাকবে।

যে মানুষটি সারাজীবন মানুষের দুঃখের গল্প লিখেছেন, আজ তার নিজের পরিবারের দুঃখের গল্প শোনার মতো মানুষ কি আমরা হতে পারি না?

সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়, এটি মানুষের পাশে দাঁড়ানোরও দায়িত্ব। অথচ সেই পেশার একজন মানুষ দুঃসময়ে কতটা একা হয়ে যেতে পারেন, পুলক দার জীবন আমাদের সেই কঠিন বাস্তবতা দেখিয়ে গেল।

পুলক দার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। বৌদি ও সন্তানের জন্য রইল অন্তরের গভীর থেকে সমবেদনা।

আমরা যেন কোনো সহকর্মীর মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের খোঁজ নেওয়ার বদলে, বেঁচে থাকতেই তাঁর দুঃসময়ে পাশে দাঁড়াতে শিখি।

খুঁজুন