জ্ঞান অর্জনের জন্য সুদূর চীনেও যেতে হলে যাও।”
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নামে বহুল প্রচলিত এই বাণীটি ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি। এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা আমাকে আকৃষ্ট করেছে। বিশেষ করে চীন সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল শৈশবেই।
এ পর্যন্ত চারবার চীন ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে। প্রথমবার ২০১৩ সালে চীনে গেলেও শেনজেন শহরে যাওয়া হয়নি। অথচ কয়েক দশকের ব্যবধানে শেনজেনের বিস্ময়কর অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আধুনিক নগরায়ণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প ও বাণিজ্যের বিকাশ আমাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করত।
ভ্রমণ আমার কাছে শুধু বিনোদন নয়; নতুন কিছু দেখা, জানা ও শেখার সুযোগ। সেই আগ্রহ থেকেই ২০১৬ সালে প্রথম এবং দশ বছর পর ২০২৬ সালের এপ্রিলে দ্বিতীয়বার শেনজেন ভ্রমণ করি।
দুটি সফরের অভিজ্ঞতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রথমবার হোটেল পেতে যে বিড়ম্বনার মুখোমুখি হয়েছিলাম, তা যেমন ভোলার নয়, তেমনি দ্বিতীয়বার অনিচ্ছায় একটি পুরাতন গাড়ির বাজারে প্রবেশ করে যে বিস্ময়ের সম্মুখীন হয়েছিলাম, সেটিও আমার ভ্রমণজীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
২০১৬: একা শেনজেন যাত্রা ও অপ্রত্যাশিত বিড়ম্বনা:
২০১৬ সালে দি সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের ব্যবসায়িক কাজে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক, জামালপুর-২ আসনের তিনবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও আমার শ্রদ্ধাভাজন সহকর্মী সুলতান মাহমুদ বাবুর সঙ্গে গুয়াংজুসহ চীনের কয়েকটি শহরে যাই। দেশ-বিদেশের বহু সফরে তাঁর সান্নিধ্য ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে অনেক কিছু শিখেছি।
সেই সফরে শেনজেনে আমাদের নির্দিষ্ট কোনো ব্যবসায়িক কাজ ছিল না। তবে শহরটি দেখার দীর্ঘদিনের আগ্রহ থেকে গুয়াংজুতে অবস্থানকালে এক রাত ও দুই দিনের সময় বের করে শেনজেন ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিই।
তিনি প্রথমে আমার সঙ্গে যেতে সম্মত হন। কিন্তু গুয়াংজুর রেলস্টেশনে পৌঁছে স্বাস্থ্যগত কারণে আর ভ্রমণ করতে পারেনি।
মুহূর্তের জন্য কিছুটা দ্বিধায় পড়লাম। বিদেশের অপরিচিত শহরে একা যাওয়া, আগে থেকে হোটেল বুকিং না থাকা এবং ভাষাগত সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না।
তখন মনে পড়ল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত গানের সেই পঙ্ক্তি—
“যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।”
সেই প্রেরণায় ও সহকর্মীর অনুমতিতে একাই ট্রেনে শেনজেনের উদ্দেশে রওনা হলাম। ইচ্ছা ছিল অন্তত দুটি স্থান দেখব—Window of the World এবং সমুদ্রতীরবর্তী এলাকা।
শেনজেনে পৌঁছে সমুদ্রতীরবর্তী এলাকার কাছাকাছি হোটেল খুঁজতে শুরু করলাম। সারি সারি হোটেল দেখে মনে হলো, থাকার ব্যবস্থা পেতে সমস্যা হবে না।
কিন্তু বাস্তবে অপেক্ষা করছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা।
প্রথম হোটেলে অভ্যর্থনাকর্মী হাসিমুখে স্বাগত জানালেন। কিন্তু পাসপোর্ট হাতে দেওয়ার পরই তাঁর হাসিমুখ মলিন হয়ে গেল। দুঃখ প্রকাশ করে জানালেন, আমাকে কক্ষ দেওয়া সম্ভব নয়।
দ্বিতীয় হোটেলেও একই ঘটনা। এরপর তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম—এভাবে ডজনখানেকের বেশি হোটেলে চেষ্টা করেও কক্ষ পেলাম না।
প্রতিবারই প্রথমে হাসিমুখে অভ্যর্থনা, তারপর পাসপোর্ট দেখার পর প্রত্যাখ্যান!
সে সময়ে ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজানে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছিল। তখন আমার মনে হয়েছিল, সম্ভবত ওই ঘটনার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।
একজনের পরামর্শে Window of the World এলাকার হোটেলগুলোতেও চেষ্টা করলাম। সেখানেও একই অভিজ্ঞতা।
এ সময় এক স্থানীয় যুবক স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আমাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন। তিনি নিজে কয়েকটি হোটেলে যোগাযোগ করলেন। কিন্তু তাঁর চেষ্টাও সফল হলো না। শেষ পর্যন্ত তিনি পুলিশ স্টেশনের সহযোগিতা নেওয়ার পরামর্শ দিলেন।
আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, রেলস্টেশনের কাছে শেষবারের মতো চেষ্টা করব। সেখানেও থাকার ব্যবস্থা না হলে গুয়াংজুতে ফিরে যাব, যেখানে আমাদের পূর্বনির্ধারিত হোটেলে আমার সহকর্মী অবস্থান করছিলেন।
দীর্ঘ যাতায়াত, একের পর এক প্রত্যাখ্যান এবং অনিশ্চয়তায় ততক্ষণে শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।
অবশেষে রেলস্টেশনের কাছাকাছি একটি হোটেলে থাকার ব্যবস্থা হলো।
দীর্ঘ বিড়ম্বনার পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। সেদিনের অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার মধ্যেও অপরিচিত যুবকের আন্তরিক সহযোগিতা একটি সুন্দর স্মৃতি হয়ে রইল।
Window of the World: ক্লান্তির পর অন্যরকম আনন্দ:
পরদিন সকালে গেলাম বহুকাঙ্ক্ষিত Window of the World-এ।
শেনজেনের নানশান জেলায় অবস্থিত এই বিখ্যাত থিম পার্কটি ১৯৯৪ সালে চালু হয়। প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার বর্গমিটার এলাকাজুড়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক নিদর্শনের প্রতিরূপ নির্মাণ করা হয়েছে।
এখানে রয়েছে প্যারিসের আইফেল টাওয়ার, ভারতের তাজমহল, মিসরের পিরামিড, ইতালির পিসার হেলানো টাওয়ারসহ নানা বিখ্যাত স্থাপনার ক্ষুদ্রাকৃতির প্রতিরূপ।
একটি স্থানে দাঁড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইতিহাস, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এমন অভিনব আয়োজন আমাকে মুগ্ধ করল।
আগের দিনের সমস্ত ক্লান্তি ও বিড়ম্বনা যেন দূর হয়ে গেল। মনে হলো, এত কষ্ট করে শেনজেনে আসার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল না।
অন্যরকম ভালোলাগা ও স্মৃতি নিয়ে গুয়াংজুতে ফিরে এলাম।
২০২৬: দশ বছর পর আবার শেনজেন:
২০২৬ সালের এপ্রিলে আবার শেনজেন যাওয়ার সুযোগ হলো। এবার আমরা ১৪ জনের একটি ভ্রমণদল। দলের অধিকাংশ সদস্য আগে শেনজেন ভ্রমণ করেননি। তাই শহরটিকে ভ্রমণসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
একটি গাড়িতে করে আমরা রওনা হলাম। পথে ২০১৬ সালের সেই একাকী সফরের কথা মনে পড়ছিল। এবার আর একা নই, সঙ্গে বড় একটি দল।
শেনজেনের প্রশস্ত সড়ক, সুউচ্চ অট্টালিকা, দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য, পরিকল্পিত অবকাঠামো এবং সবুজায়নের সমন্বয় আমাকে আকৃষ্ট করল।
১৯৮০ সালে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর শেনজেন দ্রুত বিকশিত হয়ে শিল্প, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
দিনের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণের একপর্যায়ে আমরা গেলাম শেনজেনের ইয়ানতিয়ান জেলায় অবস্থিত ডামেইশা সমুদ্রসৈকতে (Dameisha Beach)।
দক্ষিণ চীন সাগরের উপকূলবর্তী এই জনপ্রিয় পর্যটন এলাকায় প্রায় ১.৮ কিলোমিটার দীর্ঘ বালুকাবেলা রয়েছে।
বিস্তৃত সবুজ মাঠ, সারিবদ্ধ পামগাছ, পরিচ্ছন্ন হাঁটার পথ এবং সমুদ্রের জলরাশি মিলে অপূর্ব পরিবেশ। কেউ পরিবার নিয়ে বেড়াতে এসেছেন, কেউ শিশুদের সঙ্গে খেলছেন, আবার কেউ সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে অবসর কাটাচ্ছেন।
বিশেষ করে ব্যস্ত শিল্প ও বাণিজ্যিক শহরে এমন সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নাগরিক বিনোদনের ব্যবস্থা আমাকে আকৃষ্ট করেছে।
সেখানে কিছুক্ষণ সময় কাটালাম, স্মৃতি হিসেবে কয়েকটি ছবিও তুললাম।
এদিকে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতে শুরু করল। দিনের আলোয় দেখা শেনজেন তখন রঙিন আলোকসজ্জায় নতুন রূপ ধারণ করেছে। সুউচ্চ ভবন, আধুনিক বিপণিবিতান, আলোকিত সড়ক আর কর্মচঞ্চল নগরজীবন মিলে অন্যরকম দৃশ্য।
আমাদের ভ্রমণসূচিতে তখনো একটি স্থান বাকি।
পুরাতন গাড়ির বাজার!
পুরাতন গাড়ির বাজার! আমার এত অনাগ্রহ কেন?
দলের নেতা বিশেষ আগ্রহে শেনজেনের একটি পুরাতন গাড়ির বাজার ভ্রমণসূচিতে রেখেছিলেন। অথচ স্থানটি আমার পছন্দের তালিকায় ছিল না।
পুরাতন গাড়ির বাজার বলতেই চোখের সামনে ভেসে উঠত বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে দেখা কিছু পরিচিত দৃশ্য—রাস্তার পাশে কিংবা খোলা জায়গায় সারিবদ্ধভাবে রাখা ব্যবহৃত গাড়ি। কোনোটি ধুলাবালিতে ঢাকা, কোনোটি দীর্ঘ ব্যবহারে বিবর্ণ, আবার কোনোটি দেখতে অনেকটা পরিত্যক্ত গাড়ির মতো।
এমন একটি বাজার দেখতে সময় ব্যয় করার বিশেষ কারণ খুঁজে পাচ্ছিলাম না।
তার ওপর সেদিন অ্যালার্জির সমস্যায় ভুগছিলাম এবং চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করছিলাম।
মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, দলের নেতাকে অনুরোধ করে গাড়িতেই অপেক্ষা করব। অন্যরা বাজার ঘুরে ফিরে এলে আবার তাঁদের সঙ্গে যাত্রা করব।
তবে দলীয় সিদ্ধান্তকে সম্মান করে ভ্রমণসূচি পরিবর্তনের অনুরোধ করিনি।
সন্ধ্যার পর আমাদের গাড়ি দিনের শেষ গন্তব্যে পৌঁছাল।
দলের সবাই গাড়ি থেকে নামতে শুরু করলেন। আমি তখনো অনাগ্রহী।
কৌতূহলবশত গাড়ির বাইরে উঁকি দিলাম।
কিন্তু কোথায় পুরাতন গাড়ির বাজার?
চারপাশে তাকিয়ে আমার কল্পনার সঙ্গে মেলে এমন কিছুই দেখতে পেলাম না। নেই কোনো খোলা মাঠ, নেই এলোমেলোভাবে রাখা পুরাতন গাড়ি, নেই ধুলাবালিতে ঢাকা গাড়ির সারি।
বরং চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল, সুদৃশ্য ও অত্যাধুনিক একটি অট্টালিকা।
ভবনটির আকর্ষণীয় স্থাপত্য ও আলোকসজ্জা দেখে অবাক হলাম।
মনে প্রশ্ন জাগল, আমরা কি সত্যিই পুরাতন গাড়ির বাজারে এসেছি, নাকি অন্য কোথাও?
কৌতূহল এবার অনাগ্রহকে ছাড়িয়ে গেল।
দলের অন্যদের অনুসরণ করে গাড়ি থেকে নেমে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করলাম।
ভেতরে পা রাখতেই বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম!
এ আমি কী দেখছি!
আমার কল্পনার পুরাতন গাড়ির বাজারের সঙ্গে বাস্তব দৃশ্যের যেন কোনো মিলই নেই।
চারদিকে বিশাল, সুসজ্জিত প্রদর্শনীকেন্দ্র। সারিবদ্ধভাবে রাখা অসংখ্য বিলাসবহুল গাড়ি। ঝকঝকে মেঝে, উজ্জ্বল আলোকসজ্জা, সুউচ্চ ছাদ এবং আধুনিক স্থাপত্যের সমন্বয়ে অপূর্ব পরিবেশ।
মার্সিডিজ-বেঞ্জ, বিএমডব্লিউ, পোর্শেসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের অভিজাত গাড়ি এমনভাবে সাজানো, যেন কোনো আন্তর্জাতিক মোটর প্রদর্শনী চলছে।
এক সারির পর আরেক সারি। এক অংশ থেকে অন্য অংশে গিয়ে নতুন নতুন মডেলের গাড়ি চোখে পড়ছে।
কোনোটির রং কালো, কোনোটির সাদা, কোনোটির নীল, আবার কোনোটির উজ্জ্বল লাল। ভবনের ভেতরে এসকেলেটর, প্রশস্ত প্রদর্শনী এলাকা এবং আকর্ষণীয় স্থাপত্য দেখে মনে হচ্ছিল, বিলাসবহুল গাড়ির জন্য নির্মিত কোনো আন্তর্জাতিক শপিং মলে এসেছি।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এগুলো মূলত ব্যবহৃত গাড়ি! তবে কোন কোনটি এমন যে মাত্র কয়েক মাস ব্যবহৃত হয়েছে।
প্রদর্শনীকেন্দ্রটি এতটাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি ছিল যে, আমরা সেখানকার মেঝেতেই নামাজ আদায় করেছি।
এই অভিজ্ঞতাটি আমার কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয়। যে স্থানটিকে আমি ধুলাবালিতে ভরা পুরাতন গাড়ির বাজার হিসেবে কল্পনা করেছিলাম, বাস্তবে সেটির পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত।
কিছুক্ষণ আগেও যে স্থানে প্রবেশ করতে চাইনি, এখন সেখানকার প্রতিটি অংশ ঘুরে দেখার আগ্রহ তৈরি হলো।
গাড়িগুলোর পাশাপাশি ভবনের স্থাপত্য, আলোকসজ্জা এবং সাজানো-গোছানো পরিবেশের ছবি তুললাম। নিজের ছবিও তুললাম এই বিস্ময়কর প্রদর্শনীকেন্দ্রে।
মনে মনে ভাবছিলাম, পুরাতন গাড়ির বাজার সম্পর্কে আমার এত দিনের ধারণা কত সীমিত ছিল!
আওকাংদা: বিশ্বের বৃহত্তম ব্যবহৃত গাড়ির শোরুম
পরে প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে জানতে গিয়ে বুঝলাম, এটি সাধারণ কোনো গাড়ির বাজার নয়।
এর নাম আওকাংদা (Aokangda বা AKD Luxury Car Mall)।
শেনজেনের লুওহু জেলায় অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু ১৯৯৯ সালে। ২০১৩ সালে সেখানে সুবিশাল গাড়ি প্রদর্শনীকেন্দ্র চালু করা হয়।
ভবনটির মোট নির্মিত আয়তন প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার বর্গমিটার, অর্থাৎ প্রায় ১২ লাখ ৯২ হাজার বর্গফুট। এর মধ্যে ছয়টি গাড়ি প্রদর্শনী ফ্লোর রয়েছে।
২০২০ সালের ২৮ জুলাই প্রতিষ্ঠানটি ৭২,৫৯৮.৭৩ বর্গমিটার প্রদর্শনী এলাকার জন্য বিশ্বের বৃহত্তম ব্যবহৃত গাড়ির ডিলারশিপ ভবন হিসেবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের স্বীকৃতি লাভ করে।
প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, এই বিশাল প্রদর্শনীকেন্দ্রে প্রায় ৩,০০০টি গাড়ি রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে রোলস-রয়েস, বেন্টলি, ফেরারি, ল্যাম্বরগিনি, পোর্শে, মার্সিডিজ-বেঞ্জ, বিএমডব্লিউ, অডিসহ বিশ্বের বিভিন্ন বিখ্যাত ব্র্যান্ডের গাড়ি কেনাবেচা হয়।
শুধু গাড়ি বিক্রি নয়; গাড়ি সংগ্রহ, মূল্যায়ন, কারিগরি পরীক্ষা, অর্থায়ন, মালিকানা হস্তান্তর এবং বিক্রয়োত্তর সেবার ব্যবস্থাও রয়েছে।
এই তথ্যগুলো জানার পর আমার বিস্ময় আরও বেড়ে গেল।
যে ব্যবসাকে আমি এতক্ষণ সাধারণ পুরাতন গাড়ি কেনাবেচার বাজার হিসেবে ভাবছিলাম, সেটি আসলে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও বৃহৎ একটি বাণিজ্যিক উদ্যোগ।
একজন উদ্যোক্তার চোখে অভিজ্ঞতাটি:
আমি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই বিদেশের কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের সময় শুধু পণ্য বা স্থাপনার সৌন্দর্য নয়, তার ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো এবং ব্যবসায়িক ধারণার দিকেও মনোযোগ দিই।
আওকাংদায় প্রবেশ করে প্রথমে ভবনের সৌন্দর্য ও গাড়ির বিশাল সংগ্রহ দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই অন্য একটি বিষয় আমাকে ভাবাতে শুরু করল।
একটি পুরাতন গাড়ির ব্যবসাকে কীভাবে এত বড়, আধুনিক ও অভিজাত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা সম্ভব হলো?
একই পণ্য বিভিন্ন পরিবেশে বিক্রি হতে পারে—কোথাও অগোছালোভাবে, কোথাও সাধারণ শোরুমে, আবার কোথাও অত্যন্ত সুপরিকল্পিত পরিবেশে। পণ্য একই থাকলেও পরিবেশ বদলালে ক্রেতার চোখে তার মূল্যও বদলে যায়।
আওকাংদা দেখে উপলব্ধি করলাম, একটি ব্যবসার গ্রহণযোগ্যতা তৈরিতে পণ্যের মানের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, উপস্থাপনা, গ্রাহকসেবা এবং ক্রেতার আস্থারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
ব্যবহৃত গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতার অন্যতম উদ্বেগ থাকে গাড়ির প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে। মান যাচাই, সেবার নিশ্চয়তা এবং স্বচ্ছ লেনদেনের মাধ্যমে সেই উদ্বেগ কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশের কথাও মনে পড়ল।
আমাদের দেশেও ব্যবহৃত গাড়ির বাজার রয়েছে। তবে এমন সুসংগঠিত উদ্যোগ থেকে অবকাঠামো, বিপণন, গ্রাহকসেবা ও ব্যবস্থাপনার কিছু শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ আছে। অবশ্য বাংলাদেশের বাজারের আকার ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা চীনের মতো নয়।
কিন্তু একটি বিষয় সব দেশের ব্যবসার ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ—সঠিক পরিকল্পনা, উপস্থাপন ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচিত একটি ব্যবসাকেও নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
সেদিন আমার কাছে আওকাংদা শুধু পুরাতন গাড়ির বাজার ছিল না; ছিল একটি ব্যবসায়িক ধারণাকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ।
দুটি সফর, দুটি শিক্ষা:
আওকাংদা প্রদর্শনীকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসার সময় দিনের শুরুর কথাগুলো মনে পড়ছিল।
কী আশ্চর্য!
যে স্থানটি দেখার ব্যাপারে আমার কোনো আগ্রহ ছিল না, যেখানে না নেমে গাড়িতে বসে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সেই স্থানটিই শেষ পর্যন্ত পুরো সফরের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে রইল।
সেদিন যদি অনাগ্রহের কারণে গাড়ি থেকে না নামতাম, তাহলে হয়তো এমন একটি বিস্ময়কর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নিজের চোখে দেখার সুযোগ হারাতাম।
মনে পড়ল ২০১৬ সালের প্রথম শেনজেন সফরের কথাও।
সেবার শ্রদ্ধাভাজন সহকর্মী শেষ মুহূর্তে যেতে অপারগতা প্রকাশ করেছিলেন। আমিও যদি একা যাওয়ার সাহস না করতাম, তাহলে হয়তো Window of the World দেখার সুযোগ হতো না।
২০১৬ সালের সফর আমাকে শিখিয়েছিল, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও অপরিচিত মানুষের আন্তরিক সহযোগিতা পাওয়া যায়। দীর্ঘ কষ্ট ও অনিশ্চয়তার পরও ভ্রমণ অসাধারণ আনন্দ এনে দিতে পারে।
আর ২০২৬ সালের সফর আমাকে শিখিয়েছে, কোনো স্থান বা বিষয় সম্পর্কে নিজের পূর্বধারণাকে চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। বাস্তবে না দেখলে অনেক কিছুই আমাদের অজানা থেকে যায়।
দুটি সফরের মধ্যে ব্যবধান দশ বছরের। প্রথমবার গিয়েছিলাম একা, দ্বিতীয়বার ১৪ জনের দলের সঙ্গে। প্রথমবার সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা ছিল হোটেল পেতে বিড়ম্বনা এবং Window of the World দেখার আনন্দ। দ্বিতীয়বার ডামেইশা সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্যের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় বিস্ময় ছিল একটি পুরাতন গাড়ির বাজার।
আমরা অনেক সময় ভাবি, বিদেশ ভ্রমণের উদ্দেশ্য শুধু বিখ্যাত স্থান দেখা, সুন্দর ছবি তোলা কিংবা আনন্দময় কিছু সময় কাটানো। কিন্তু ভ্রমণের প্রকৃত প্রাপ্তি কখনো কখনো এসবের বাইরেও থাকে।
কোনো অপ্রত্যাশিত বিড়ম্বনা আমাদের ধৈর্য শেখায়, অপরিচিত মানুষের সহযোগিতা মানবিকতার প্রতি বিশ্বাস বাড়ায়, আবার অনিচ্ছায় দেখা একটি স্থানও আমাদের চিন্তার জগতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
শেনজেনের এই দুটি সফর আমাকে নতুন করে উপলব্ধি করিয়েছে—ভ্রমণের সার্থকতা শুধু কতগুলো স্থান দেখলাম, তার মধ্যে নয়; বরং যা দেখলাম, তা থেকে কতটুকু শিখলাম, তার মধ্যেই।