শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
শিক্ষা এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না ৩৬% শিক্ষার্থী

এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না ৩৬% শিক্ষার্থী

ইরফান শেখ (লেখক ও বিশ্লেষক) :
৩৬% শিক্ষার্থী ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিচ্ছে না। মানে দেশের তিন ভাগের এক ভাগ শিক্ষার্থী পরীক্ষা দেয় নাই। এটা নিয়ে প্রথম আলো, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, সিভিল সোসাইটির দারুণ মাথা ব্যাথা।
অথচ আমি অবাক হচ্ছি কেন দেশের ৬৪% শিক্ষার্থী এই পরীক্ষাটা দিতে গেছে! এই পরীক্ষা দিয়ে কী হয়? কোন উদ্দেশ্যে কেউ এইচএসসি পরীক্ষাটা দিবে?
বাঙলাদেশের যে কোন টিপিকাল গ্রামে আপনি যান। দেখবেন স্কুলগুলো খালি। বড় বড় সরকারি বিদ্যালয়ের বিল্ডিং খালি পড়ে আছে। ক্লাসরুম ৩০% ভরে না। বাকি ৭০% এর অর্ধেক পড়ে হিফজ আর বাকি অর্ধেক কিছু করে না, বাবার সাথে কৃষিতে হেল্প করার অভিনয় করে মূলত জুয়া খেলে, ঘুমায়া থাকে, খালের উপর ব্রিজে বসে ফ্রি ফায়ার খেলে, সিগারেট গাঞ্জা আর গুটি খায়। টিকটক করে।
নাক উঁচু যে ৩০% পোলাপানের কথা প্রথমে বললাম তারা এসএসসি পাশ করে চাকরি পায় না। এইচএসসি করেও পায় না। তখন আইদার লেবার ভিসায় মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার ট্রাই করে, লিবিয়া দিয়ে ইতালি যাওয়ার ট্রাই করে। আর তার চেয়ে বড় লুজার হইলে একটা ডিগ্রি কলেজ কি হবিগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মত কোন একটা বেশ্যাবেদ্যালয়ে ফার্সি সাহিত্যে ভর্তি হয়।
৪ বছরের কোর্স ৬ বছরে শেষ করে চাকরি পায় না। ফারসিতে মাস্টার্স করে। তারপর চাকরি পায় না। শেষে বিদেশ যায়, একটা মুদি দোকানে বসে, বিয়া করে চড়া যৌতুকের টাকায় বাইক কিনে পাঠাও চালায় আর নাহয় ইজি বাইক চালায়। এটাই সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা আমাদের এই বাঙলাদেশ।
নব্বই দশকে বাঙলাদেশের গ্রামের কৃষকটা এনজিও, সরকার আর বিটিভির ছায়াছবির ফাঁদে পা দিয়ে ভেবেছে: তার ছেলে মাঠে কাজ করবে না। মাঠে কাজ করা খ্রাপ।
সে কলেজ পাশ করে দৌড়ে এসে বাড়ি মাথায় তুলে নদীয়া শান্তিনিকেতনের টোনে বলবে, "মা মা মা, আমি পাশ করেছি"। তারপর কোট-টাই পরে সে চাকরি করে বাবা মাকে গাড়ি কিনে দিয়ে পরিবারের সকল দুঃখ দূর করবে।
বাঙলাদেশের মানুষ আশি-নব্বই এর দশক থেকে এই লোভে পড়ে, মধ্যবিত্ত হবার স্বপ্নে বিভোর হয়ে স্কুল কলেজ গাইড কোচিং ব্যাচ টেস্ট পেপার টিউশনি গ্রুপ কোর্স প্রি টেস্ট মডেল টেস্ট শিট নোটে এতো খরচ করেছে যে শিক্ষা-শিল্প খাত এখন ঢাকা জেলার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক খাত।
শিশুর ৫ বছর থেকে শুরু করে ২৭ বছর পর্যন্ত ২০ লাখ টাকা শিক্ষায় খরচ করে ৯০ দশকের বাবা মায়েদের প্রাপ্তি হলো একটা অশ্বডিম্ব।
হাজার হাজার গ্রামে কোন ছেলে পেলে চাকরি পায় নাই। হাজার হাজার গ্রামে মাত্র ১ জন কি ২ জন চাকরি পেয়েছে। বাকিরা হিংসা করেছে। ভেবেছে এটা ওর কপালের দোষ অথবা সে ভালো করে পড়ে নাই বলে আজকে এই দশা। ভালো করে পড়াশুনাটা করলে আজকে সেও অমুক ব্যাংকে চাকরি করতে পারতো। অতএব, আবার জুয়ায় টাকা লাগা। এবার নিজের ছেলের পিছনে আবার ২০ লাখ খরচ কর। কিন্তু স্কুল কোচিং ব্যাচ ভারী ব্যাগ দিয়ে সন্তানের শৈশবের সর্বনাশ করার পরেও রেসাল্ট সেইম। ছেলেও লুজ়ার হইছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েও ছেলের চাকরি হয় না।
বাই ২০১০ সাল - দুই জেনারেশনের লাইফ নষ্ট করার পর গ্রামগুলো শিখেছে যে পড়াশুনা করে কোন বালটাও হয় না। এই পড়ালেখা জিনিসটা স্ক্যাম।
তার উপর ১৯৯০ থেলে ২০২০ পর্যন্ত ধাপে ধাপে শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে। এই ধ্বংসের জন্য দায়ী মূলত কোচিং আর টিউটর। তারা শিক্ষার্থীদের বুঝিয়েছে মেইন বই সব পড়ার দরকার নেই। শর্টকাট আছে। এই নাও শিট, এই নাও মডেল কোয়েশ্চেন। শিটেরও শিট। সেই শিটের মেইড ইজি। মেইড ইজিরও সামারি। সামারির চ্যাট জিপিটি।
এভাবে শর্টকাট করতে গিয়ে পড়াশুনায় এখন আর কোন "ম্যাটার" নাই। আছে কেবল টিপস অ্যান্ড ট্রিকস। ট্রিক করতে করতে, পাশ করিয়ে দিতে দিতে রিডিং পড়তে না পারা পোলাপান সিক্সে উঠে যাচ্ছে। এক বাক্য শুদ্ধ ইংরেজিতে কথা বলতে ব্যর্থ পোলাপান বেশ্যাবেদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে।
এই সব মিলিয়ে এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে ফেইল্ড এজুকেশন সেক্টরটা বাঙলাদেশে। দুই প্রজন্ম ধরে জলে টাকা ঢালার পর গ্রাম ও মফস্বলে লোকে টের পেয়েছে - ২০ লাখ ট্যাকা দিয়া স্কুল কলেজ পড়ে লাইফের ২৫ বছর নষ্ট করার চেয়ে ফুড কার্ট দেওয়া বেটার, একটা ব্যাটারি রিক্সা কেনা বেটার, শিশু বয়সে বিয়ে বসে আরেক ব্যাডার ঘাড়ে চড়ে খাওয়া বেটার, ভূমধ্যসাগর কি থাই উপসাগর পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়া-ইতালি গেম দেওয়া বেটার।
বাঙলাদেশের সেরা ১০ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটিতে টপ চয়েজ একটা ডিপার্টমেন্ট থেকে পাশ করে বের হয়ে আজ ২ বছর পর আমার সহপাঠীদের মধ্যে ৫%ও একটা স্ট্যাবল চাকরি পায় নাই। রাষ্ট্র, বিশ্ববিদ্যালয়, বাজার-অর্থনীতি আর শিক্ষা ব্যবস্থা তাদের সাথে প্রতারণা করে তাদেরকে নিয়মিত আত্মহত্যা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করছে, পরিবারের কাছে অপদস্থ করছে।
খটখটিয়া ডিগ্রি কলেজ থেকে পাশ করা একজন ফিলোসফি গ্রাজুয়েটের কথা আপনি চিন্তা করেন। সে তো সামনে শুধু অন্ধকার দেখে।
আপনারা অবাক হইতাছেন কেন ৩৬% পোলাপান পরীক্ষা দেয় নাই!? এই প্রশ্নই ভুল। প্রশ্ন করেন - কেন ৬৪% পোলাপান এই আজাইরা পরীক্ষা দিতে গেছে।

খুঁজুন