সাম্প্রদায়িকতা শুধু উগ্র মানুষের হাতে বেঁচে থাকে না; রাষ্ট্রীয় প্রশ্রয়, প্রশাসনিক পক্ষপাত এবং রাজনৈতিক স্বার্থও তাকে বাঁচিয়ে রাখে। রাষ্ট্র চাইলে সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার রুখতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানই যদি নাগরিকের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—রাষ্ট্র কি সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ করছে, নাকি নিজের আচরণেই বিভাজনকে আরও গভীর করছে?
ধানমন্ডি ২৭-এর মিনা বাজারের সামনে শিল্পী-জনতার ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে আমরা শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনে দাঁড়িয়েছিলাম। হাতে অস্ত্র ছিল না, ছিল প্রতিবাদের কণ্ঠ। অথচ পুলিশ এসে সেই পরিবেশ অশান্ত করে তুলল।
পুলিশ আমাকে দেখেই প্রশ্নের পর প্রশ্ন করতে থাকে—কিসের প্রোগ্রাম, কী প্রোগ্রাম! দীপক মূলত আমাকে সাহস দিতেই সেখানে এসেছিল। পেছন থেকে আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘আপা, আমি আছি।’
এরপর পুলিশ আমাদের বলল, ‘আপনারা জয় বাংলা স্লোগান দেবেন না।’
আমি বললাম, দেব না।
কিন্তু পুলিশ যখন বলল, ‘জয় বাংলা স্লোগান নষ্ট হয়ে গেছে’, তখন দীপক প্রতিবাদ করল। বলল, ‘জয় বাংলা স্লোগান নষ্ট হবে কেন? এই স্লোগান আমাদের একাত্তরের চেতনা। এটি কোনো দলের নয়, সবার।’
এই কথার পরই পুলিশ নির্দেশ দিল, ‘এই দুজনকে থানায় নিয়ে যা।’
এরপর দীপককে ও আমাকে টানাহেঁচড়া করা শুরু হলো। পাশে মহিলা পুলিশ সদস্য থাকলেও তাঁরা এগিয়ে আসেননি। পুরুষ পুলিশ সদস্যরাই একজন নারী কে টানাহেঁচড়া করছিলেন। আমি আমার সর্বশক্তি দিয়ে দীপককে আটকানোর চেষ্টা করেছি। পারিনি।
অবাক হয়ে দেখলাম কীভাবে একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠল। একজন মানুষ মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্লোগানের পক্ষে কথা বললেন, আর তার পরিণতিতে তাঁকে থানায় নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো। কেন এই নির্দেশ, কোন আইনি ভিত্তিতে এই আচরণ—তার জবাব পুলিশকেই দিতে হবে।
জয় বাংলা কোনো দলের পৈতৃক সম্পত্তি নয়। এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ, আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রামের উত্তরাধিকার। কোনো দল এই স্লোগানকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করলেই তার ঐতিহাসিক মর্যাদা শেষ হয়ে যায় না। ইতিহাসের অপব্যবহারের প্রতিবাদ করা যায়, কিন্তু ইতিহাসকে অস্বীকার করে নয়। আর কোনো পুলিশ সদস্যের ব্যক্তিগত মন্তব্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূল্য নির্ধারিত হতে পারে না।
প্রশ্ন হলো, এই রাষ্ট্রে শিল্পীর স্বাধীনতা কোথায়? নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকার কোথায়? শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করতে গেলেও কি এখন পুলিশের পছন্দ-অপছন্দ বুঝে কথা বলতে হবে? পুলিশ কি আইন রক্ষার দায়িত্ব পালন করবে, নাকি কোন স্লোগানের মর্যাদা থাকবে আর কোনটি থাকবে না, সেই সিদ্ধান্তও নেবে?
সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো যদি নাগরিকের অধিকার রক্ষার বদলে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে, তাহলে সম্প্রীতির বুলি অর্থহীন হয়ে পড়ে। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই মানে শুধু উগ্রবাদীদের থামানো নয়; রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, বৈষম্য এবং নাগরিকের কণ্ঠরোধের প্রবণতার বিরুদ্ধেও দাঁড়ানো।
আমরা বুক চিতিয়ে রাজপথে আন্দোলন করেছি অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, মানুষের মর্যাদা রক্ষার জন্য, একটি স্বাধীন ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের জন্য। সেই বাংলাদেশ কি এমন হওয়ার কথা ছিল, যেখানে শিল্পীর স্বাধীনতা অনিশ্চিত, প্রতিবাদী নাগরিক হেনস্তার শিকার হন, আর মুক্তিযুদ্ধের স্লোগানের পক্ষে কথা বলাও বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়?
এই নাভিশ্বাস ওঠা, অচল, স্থবির বাংলাদেশ কি আমাদের স্বপ্ন ছিল? এই ভীত, বিভক্ত, সাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্যই কি আমাদের এত সংগ্রাম?
*রাষ্ট্রের শক্তি কতজনকে থানায় নেওয়া যায়, তা দিয়ে মাপা হয় না। রাষ্ট্রের শক্তি মাপা হয় কতজন নাগরিককে নির্ভয়ে কথা বলতে দেওয়া যায়, তা দিয়ে।*
আমি এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাই। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত চাই। পুলিশের আচরণের ব্যাখ্যা চাই। কোনো সদস্য আইনবহির্ভূত আচরণ করে থাকলে তার জবাবদিহি চাই।
রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে, নাগরিকের কণ্ঠরোধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না; প্রতিষ্ঠা করা যায় কেবল ভয়ের নীরবতা। আর সেই নীরবতাকে কখনোই সম্প্রীতি কিংবা গণতন্ত্র বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না।
*মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কারও দয়ার দান নয়। নাগরিকের স্বাধীনতা পুলিশের অনুগ্রহ নয়। আর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কোনো সরকারি স্লোগান নয়—এটি রাষ্ট্রের আচরণে প্রমাণ করার দায়িত্ব।*
জয় বাংলা বলবো ১০০ বার বলবো
জয় বাংলা বলবো ১০০ বার বলবো
সাম্প্রদায়িকতা শুধু উগ্র মানুষের হাতে বেঁচে থাকে না; রাষ্ট্রীয় প্রশ্রয়, প্রশাসনিক পক্ষপাত এবং রাজনৈতিক স্বার্থও তাকে বাঁচিয়ে রাখে। রাষ্ট্র চাইলে সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার রুখতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানই যদি নাগরিকের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—রাষ্ট্র কি সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ করছে, নাকি নিজের আচরণেই বিভাজনকে আরও গভীর করছে? ধানমন্ডি ২৭-এর মিনা বাজারের সামনে শিল্পী-জনতার ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে আমরা শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনে দাঁড়িয়েছিলাম। হাতে অস্ত্র ছিল না, ছিল প্রতিবাদের কণ্ঠ। অথচ পুলিশ এসে সেই পরিবেশ অশান্ত করে তুলল। পুলিশ আমাকে দেখেই প্রশ্নের পর প্রশ্ন করতে থাকে—কিসের প্রোগ্রাম, কী প্রোগ্রাম! দীপক মূলত আমাকে সাহস দিতেই সেখানে এসেছিল। পেছন থেকে আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘আপা, আমি আছি।’ এরপর পুলিশ আমাদের বলল, ‘আপনারা জয় বাংলা স্লোগান দেবেন না।’ আমি বললাম, দেব না। কিন্তু পুলিশ যখন বলল, ‘জয় বাংলা স্লোগান নষ্ট হয়ে গেছে’, তখন দীপক প্রতিবাদ করল। বলল, ‘জয় বাংলা স্লোগান নষ্ট হবে কেন? এই স্লোগান আমাদের একাত্তরের চেতনা। এটি কোনো দলের নয়, সবার।’ এই কথার পরই পুলিশ নির্দেশ দিল, ‘এই দুজনকে থানায় নিয়ে যা।’ এরপর দীপককে ও আমাকে টানাহেঁচড়া করা শুরু হলো। পাশে মহিলা পুলিশ সদস্য থাকলেও তাঁরা এগিয়ে আসেননি। পুরুষ পুলিশ সদস্যরাই একজন
নারী কে টানাহেঁচড়া করছিলেন। আমি আমার সর্বশক্তি দিয়ে দীপককে আটকানোর চেষ্টা করেছি। পারিনি। অবাক হয়ে দেখলাম কীভাবে একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠল। একজন মানুষ মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্লোগানের পক্ষে কথা বললেন, আর তার পরিণতিতে তাঁকে থানায় নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো। কেন এই নির্দেশ, কোন আইনি ভিত্তিতে এই আচরণ—তার জবাব পুলিশকেই দিতে হবে। জয় বাংলা কোনো দলের পৈতৃক সম্পত্তি নয়। এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ, আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রামের উত্তরাধিকার। কোনো দল এই স্লোগানকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করলেই তার ঐতিহাসিক মর্যাদা শেষ হয়ে যায় না। ইতিহাসের অপব্যবহারের প্রতিবাদ করা যায়, কিন্তু ইতিহাসকে অস্বীকার করে নয়। আর কোনো পুলিশ সদস্যের ব্যক্তিগত মন্তব্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূল্য নির্ধারিত হতে পারে না। প্রশ্ন হলো, এই রাষ্ট্রে শিল্পীর স্বাধীনতা কোথায়? নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকার কোথায়? শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করতে গেলেও কি এখন পুলিশের পছন্দ-অপছন্দ বুঝে কথা বলতে হবে? পুলিশ কি আইন রক্ষার দায়িত্ব পালন করবে, নাকি কোন স্লোগানের মর্যাদা থাকবে আর কোনটি থাকবে না, সেই সিদ্ধান্তও নেবে? সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো যদি নাগরিকের অধিকার রক্ষার বদলে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে, তাহলে সম্প্রীতির বুলি অর্থহীন হয়ে পড়ে। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই মানে শুধু উগ্রবাদীদের থামানো নয়; রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার
অপব্যবহার, বৈষম্য এবং নাগরিকের কণ্ঠরোধের প্রবণতার বিরুদ্ধেও দাঁড়ানো। আমরা বুক চিতিয়ে রাজপথে আন্দোলন করেছি অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, মানুষের মর্যাদা রক্ষার জন্য, একটি স্বাধীন ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের জন্য। সেই বাংলাদেশ কি এমন হওয়ার কথা ছিল, যেখানে শিল্পীর স্বাধীনতা অনিশ্চিত, প্রতিবাদী নাগরিক হেনস্তার শিকার হন, আর মুক্তিযুদ্ধের স্লোগানের পক্ষে কথা বলাও বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়? এই নাভিশ্বাস ওঠা, অচল, স্থবির বাংলাদেশ কি আমাদের স্বপ্ন ছিল? এই ভীত, বিভক্ত, সাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্যই কি আমাদের এত সংগ্রাম? *রাষ্ট্রের শক্তি কতজনকে থানায় নেওয়া যায়, তা দিয়ে মাপা হয় না। রাষ্ট্রের শক্তি মাপা হয় কতজন নাগরিককে নির্ভয়ে কথা বলতে দেওয়া যায়, তা দিয়ে।* আমি এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাই। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত চাই। পুলিশের আচরণের ব্যাখ্যা চাই। কোনো সদস্য আইনবহির্ভূত আচরণ করে থাকলে তার জবাবদিহি চাই। রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে, নাগরিকের কণ্ঠরোধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না; প্রতিষ্ঠা করা যায় কেবল ভয়ের নীরবতা। আর সেই নীরবতাকে কখনোই সম্প্রীতি কিংবা গণতন্ত্র বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না। *মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কারও দয়ার দান নয়। নাগরিকের স্বাধীনতা পুলিশের অনুগ্রহ নয়। আর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কোনো সরকারি স্লোগান নয়—এটি রাষ্ট্রের আচরণে প্রমাণ করার দায়িত্ব।*
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
রওশন টাওয়ার, (লিফট-৮) ১৫২/২/এ২ গ্রীণ রোড ,
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ ।
মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত