রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
আন্তর্জাতিক রাশিয়ার যুদ্ধের সমালোচনা করায় কারাদণ্ডের মুখে মানবিক কর্মী

রাশিয়ার যুদ্ধের সমালোচনা করায় কারাদণ্ডের মুখে মানবিক কর্মী

কৈশোর থেকেই রাশিয়াজুড়ে অসুস্থ ও প্রতিবন্ধী শিশুদের সহায়তায় কাজ করছেন লিদা মোনিয়াভার। রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধের সমালোচনা করায় এই ৩৮ বছর বয়সী মানবিক কর্মীর কারাদণ্ড হতে পারে। 

২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরুর পর তিনি ইউক্রেনীয় শরণার্থীদেরও সহায়তা শুরু করেন। 

একই সঙ্গে যুদ্ধের সমালোচনা করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটিই ইউরোপের সবচেয়ে বড় সংঘাত। 

চলতি মাসের শুরুতে তাকে গ্রেফতার করা হয়। বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত তার ওপর নজরদারিসহ গৃহবন্দিত্বের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। পায়ে পরানো হয়েছে ইলেকট্রনিক নজরদারি ডিভাইস। 

রুশ সেনাবাহিনী সম্পর্কে ‘মিথ্যা তথ্য’ ছড়ানোর অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলাটি চলছে।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে কয়েক বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হতে পারে। 

রাশিয়ায় দমন-পীড়ন ক্রমেই বাড়তে থাকলেও এ মামলায় দেশটির নাগরিক সমাজে ব্যাপক বিস্ময় ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

২০২৩ সালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টেলিগ্রামে দেওয়া একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। 

ওই পোস্টে তিনি বেসামরিক হতাহতের বিষয়ে জাতিসংঘের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন এবং রাশিয়ায় বসবাসরত ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের সহায়তার আহ্বান জানান।

মোনিয়াভা রাশিয়ায় একজন সম্মানিত ব্যক্তি। তিনি দেশটির অন্যতম পরিচিত ও কার্যকর দাতব্য সংস্থার নেত্রী। অসুস্থ ও প্রতিবন্ধী শিশুদের সেবায় রাষ্ট্রের ঘাটতি পূরণে তার প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

২০২৫ সালে তার ফাউন্ডেশন ১২০ কোটি রুবলের বেশি  তহবিল সংগ্রহ করে। রাশিয়ার হিসাবে এটি বড় অঙ্কের অর্থ। এ অর্থ দিয়ে প্রয়োজনীয় শিশুদের বিনামূল্যে ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, বাড়িতে সেবা, নার্স ও আয়া দেওয়া হয়।

৫০ বছর বয়সী এলেনা বাবিচের এক প্রতিবন্ধী ছেলে রয়েছে। 

তিনি বলেন, ‘লিদার ফাউন্ডেশনের সহায়তায় আমার ছেলে লিওশা বেঁচে আছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আজ সে স্বাভাবিক জীবনের কাছাকাছি জীবনযাপন করতে পারছে।’ 

এর কৃতিত্ব তিনি মোনিয়াভার ‘প্রতিদিনের কাজকে’ দিয়েছেন।

‘লিদা আমাদের প্রতীক এবং আমাদের আলোর দিশা। একই সঙ্গে তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি প্রতিদিন নিজের সবটুকু দিয়ে কাজ করেন।’

মস্কোতে সোভিয়েত আমলের এক বুদ্ধিজীবী পরিবারে জন্ম মোনিয়াভার। ১৬ বছর বয়সে তিনি একটি অর্থোডক্স খ্রিস্টান সংগঠনের মাধ্যমে ক্যানসারে আক্রান্ত শিশুদের সহায়তায় কাজ শুরু করেন।

তিনি সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর শিশুদের সহায়তায় পুরোপুরি নিজেকে নিয়োজিত করতে সাংবাদিকতা ছেড়ে দেন।

বেশ কয়েকটি ফাউন্ডেশনে কাজ করার পর ২০১৩ সালে তিনি মস্কোর প্রথম মুমূর্ষু শিশুদের হসপিস চালু করেন। 

এরপর ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন তার খ্যাতনামা দাতব্য তহবিল ‘হাউস উইথ দ্য লাইটহাউস।’

রাশিয়ার সমাজে অসুস্থ ও প্রতিবন্ধী মানুষকে প্রায়ই প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরিচর্যায় রাখা হয়। 

এই প্রথার শিকড় সোভিয়েত আমলে। মোনিয়াভা এ ধরনের সামাজিক নেতিবাচক ধারণা দূর করার উদ্যোগ নেন। এর অংশ হিসেবে তিনি শিশুদের নিয়ে বাইরে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেও অংশ নেন।

নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ও প্রবীণ উদারপন্থী সাংবাদিক দিমিত্রি মুরাতভ মস্কোয় মোনিয়াভার শুনানিতে এএফপিকে বলেন, ‘লিদা মোনিয়াভা জীবনের পক্ষে। আর যারা তাকে কারাগারে পাঠাতে চাইছে, তারা মৃত্যুর পক্ষে।’

যুদ্ধের আগেও তিনি উগ্র রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলোর নিশানায় ছিলেন।

কোভিড-১৯ মহামারির সময় তিনি প্রতিবন্ধী এক ছেলে শিশুকে দত্তক নেন। শিশুটির নাম কোলিয়া। তাদের হাঁটাচলা ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ছবি ও ভিডিও তিনি নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করতেন।

২০২২ সালে ১৩ বছর বয়সে কোলিয়া মারা যায়। এর কিছুদিন পর এক কট্টরপন্থী আইনজীবী তার বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ করেন। সরকারি তদন্তে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর পর মোনিয়াভা রাশিয়ায় আশ্রয় নেওয়া কয়েক লাখ ইউক্রেনীয় শরণার্থীর কিছু অংশকে সহায়তার জন্য একটি প্রকল্প চালু করেন।

যুদ্ধের প্রথম তিন বছরে ওই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ১৭ হাজার মানুষকে সহায়তা দেওয়া হয়।

কারাদণ্ডের ঝুঁকি থাকায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে না পারলেও অনেক রুশ নাগরিক মনে করেন, এ ধরনের দাতব্য ও মানবিক কাজই নিরাপদে কিছু করার একমাত্র উপায়।

প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের প্রায় সব সমালোচক ও যুদ্ধের প্রধান বিরোধীদের কেউ নিহত হয়েছেন, কেউ কারাগারে রয়েছেন অথবা নির্বাসনে আছেন।
তবে ঝুঁকি জেনেও মোনিয়াভা যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলার পথ বেছে নেন।

ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টের কারণে রুশ সেনাবাহিনীকে ‘হেয় করার’ অভিযোগে তাকে জরিমানা করা হয়।

জরিমানার পর তিনি লিখেছিলেন, ‘যুদ্ধ অশুভ। এটি ভয়াবহ এক ট্র্যাজেডি। এটি একটি অপরাধ।’

তিনি দেশত্যাগ করতেও অস্বীকৃতি জানান।

তিনি বলেন, ‘আমি দেশ ছেড়ে চলে গেলে আরও অনেক উপশমমূলক চিকিৎসার প্রয়োজন থাকা শিশু অনাথ আশ্রম ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে পড়ে থাকবে। এটা জেনে অন্য কোনো দেশে আমি কীভাবে সুখে থাকতে পারি?’

তিনি বলেন, ‘কিন্তু যুদ্ধ নেই এমনভাবে আমি চুপ করে থাকতে পারি না।’

তার বিরুদ্ধে সর্বশেষ আইনি প্রক্রিয়া শুরুর পরও তিনি দেশ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। 

তিনি বলেন, এ বিষয়ে তাকে ‘অনেক পরামর্শ’ দেওয়া হয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘আমি ঝুঁকিগুলো পুরোপুরি বুঝতে পারছি। কিন্তু এই কঠিন সময়ে রাশিয়ায় থাকাটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।’

তার ফাউন্ডেশন যাতে কাজ চালিয়ে যেতে পারে, সে জন্য তিনি পরিচালকের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
তার সমর্থকদের কাছে তাকে এভাবে নিশানা করা চরম অন্যায়।

মস্কোর ৫০ বছর বয়সী এক নারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এই রাশিয়ায় এখন সাধু-সন্তদের বিরুদ্ধেও মামলা করা হচ্ছে।’

খুঁজুন