বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
সিঙ্গাপুর থেকে গজারিয়া: এক মুগ্ধতার গল্প • গজারিয়ায় মেলা বন্ধের দাবিতে উলামায়ে কেরামের সাংবাদিক সম্মেলন • পেনাল্টি শুটআউটে চেলসিকে হারাল লিভারপুল, অল্পের জন্য রক্ষা সিটির • বিএমইটি পরিচালক মাসুদ রানার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও সম্পদ অর্জনের অভিযোগ, তদন্ত দাবি • সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে আলমগীর ইসলামের পদত্যাগ, • স্পেনে ফের ট্রেন দুর্ঘটনায় ৬৮ জনের মৃত্যু • পূর্ণাঙ্গ মসজিদ হিসেবে ব্যবহারের অনুমোদন পেল অস্ট্রেলিয়ান মুসলিম ওয়েলফেয়ার সেন্টার, • জয় বাংলা বলবো ১০০ বার বলবো • বাগেরহাটে পশুর নদীতে কয়লাবাহী কার্গো জাহাজ ডুবি • রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারেই নিহিত : প্রধানমন্ত্রী
পর্যটন সিঙ্গাপুর থেকে গজারিয়া: এক মুগ্ধতার গল্প

সিঙ্গাপুর থেকে গজারিয়া: এক মুগ্ধতার গল্প

স্বচ্ছ কাচের ওপাশে ধীরে ভেসে বেড়াচ্ছে নানা রং আর আকৃতির মাছ। পানির নিচের সেই বিচিত্র জগতের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হলো, মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিজগৎকে কত অপূর্ব বৈচিত্র্যে সাজিয়েছেন! অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে এল—সুবহানাল্লাহ!

২০২৬ সালের এপ্রিলে চীনের সাংহাইয়ের একটি অ্যাকুয়ারিয়ামে দাঁড়িয়ে এমনটিই অনুভব করেছিলাম। দেখতে দেখতে এমনভাবে মজে গিয়েছিলাম যে টেরই পাইনি, দলের সবাই কখন চলে গেছেন। শেষে সতীর্থ আব্দুল মতিন ভাই ফিরে এসে আমাকে দেখে ডাক দিলেন—‘তাড়াতাড়ি আসুন!’ আসলে সেই মগ্নতার মাঝেই স্মৃতি আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল ২০১২ সালের সিঙ্গাপুরে।

সেবারই প্রথম বন্ধুদের সঙ্গে সিঙ্গাপুরের অ্যাকুয়ারিয়াম দেখেছিলাম। দ্বিতীয়বার স্ত্রীকে নিয়ে, আর তৃতীয়বার আমার আধ্যাত্মিক শিক্ষক ও সতীর্থদের সঙ্গে। সাধারণত একই ধরনের দর্শনীয় স্থান কয়েকবার দেখলে আকর্ষণ কিছুটা কমে যায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তিনবার দেখেও আমার মুগ্ধতা এতটুকু কমেনি। বরং প্রিয়জন ও উত্তম সঙ্গীদের সাহচর্য দেখার আনন্দকে আরও গভীর করেছে।

জলজ প্রাণীর চলাফেরা, রঙের বাহার আর পুরো আয়োজনের নান্দনিকতা প্রতিবারই আমাকে নতুন করে বিস্মিত করেছে। যতবার দেখেছি, ততবারই মনে হয়েছে—আরও একটু দেখি, আরও কিছুক্ষণ থাকি। দেখার সাধ যেন মেটেই না!

এরপর ২০১৫ সালে থাইল্যান্ডে স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে অ্যাকুয়ারিয়াম দেখেছি। সেদিন তাদের উচ্ছ্বাস ছিল আমার চেয়েও বেশি, আর তা দেখে আমার আনন্দও বেড়ে গিয়েছিল। রাশিয়া ও দুবাইয়ে দেখেছি সহকর্মীদের সঙ্গে; সর্বশেষ সাংহাইয়ে, আবারও শিক্ষক ও সতীর্থদের সঙ্গে।

প্রতিটি অভিজ্ঞতায় মানুষের পরিকল্পনা, প্রকৌশল ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা দেখে অভিভূত হয়েছি। আর প্রাণিজগতের এই অপূর্ব সমারোহ প্রত্যক্ষ করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেছি। মানুষ প্রযুক্তির সাহায্যে সৃষ্টির সৌন্দর্য আমাদের সামনে তুলে ধরেছে, কিন্তু এই বিস্ময়কর জীবজগতের প্রকৃত স্রষ্টা মহান আল্লাহ।

পবিত্র কোরআনের সূরা আন-নাহলের ১৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ সমুদ্রকে মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করার কথা বলেছেন এবং তাঁর নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

 সূরা আর-রহমানের ১৯–২২ নম্বর আয়াতে দুই সমুদ্রের মিলন, তাদের মধ্যবর্তী অন্তরাল এবং উভয় থেকে মুক্তা ও প্রবাল বের হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সূরাতেই বারবার প্রশ্ন রাখা হয়েছে—‘তোমরা তোমাদের রবের কোন কোন নিয়ামত অস্বীকার করবে?’

আবার সূরা আলে ইমরানের ১৯০ নম্বর আয়াতে আসমান ও জমিনের সৃষ্টি এবং রাত-দিনের পরিবর্তনের মধ্যে জ্ঞানবানদের জন্য নিদর্শন থাকার কথা বলা হয়েছে। প্রকৃতির সৌন্দর্য তাই শুধু দেখার বিষয় নয়; সেই সৌন্দর্যের মধ্যে স্রষ্টার কুদরত ও হিকমত উপলব্ধি করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বিদেশের অ্যাকুয়ারিয়ামগুলো দেখার সময় একটি আক্ষেপ সবসময় মনে জেগেছে—আমাদের বাংলাদেশেও যদি এমন একটি অ্যাকুয়ারিয়াম থাকত! দেশের শিশু-কিশোর ও সাধারণ মানুষ বইয়ের পাতার বাইরে জীবন্ত জলজ প্রাণী দেখে প্রকৃতিকে জানতেন, আর আল্লাহর সৃষ্টির সৌন্দর্য উপলব্ধি করে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হতেন।

সেই আক্ষেপ কিছুটা হলেও ঘুচিয়েছে কক্সবাজারের রেডিয়েন্ট ফিশ ওয়ার্ল্ড এবং ঢাকার আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী জাদুঘর প্রাঙ্গণের অ্যাকুয়ারিয়াম পার্ক। দুটিই আমি প্রবল আগ্রহ ও উদ্দীপনা নিয়ে ঘুরে দেখেছি। এ উদ্যোগগুলোকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই।

রেডিয়েন্ট ফিশ ওয়ার্ল্ডে মাছের প্রদর্শনী, পানির নিচের টানেল ও ফিশ মিউজিয়াম রয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি একটি উল্লেখযোগ্য বেসরকারি পর্যটন উদ্যোগ।

অন্যদিকে আগারগাঁওয়ের অ্যাকুয়ারিয়াম পার্কে ৩৫টি অ্যাকুয়ারিয়ামসহ নানা বিনোদন ও শিক্ষামূলক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, সেখানে লোনাপানির মাছ যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। ভবিষ্যতে সামুদ্রিক প্রাণীর প্রদর্শনী সম্প্রসারিত হলে পার্কটি আরও সমৃদ্ধ হবে।

আমাদের দেশে এ ধরনের সুযোগ এখনো সীমিত। তাই এসব উদ্যোগ বিশেষভাবে প্রশংসার দাবিদার। উদ্যোক্তারা নতুনভাবে ভেবেছেন, বিনিয়োগ করেছেন এবং মানুষের সামনে জলজ প্রাণীর সৌন্দর্য তুলে ধরার ব্যবস্থা করেছেন। তাঁদের অভিনন্দন জানাই।

তবে সিঙ্গাপুর, সাংহাইসহ বিভিন্ন দেশের বৃহৎ অ্যাকুয়ারিয়াম দেখার অভিজ্ঞতা থেকে আমার প্রত্যাশা আরও বেশি। পরিসর, জীববৈচিত্র্য, গবেষণা ও শিক্ষার বিবেচনায় আমাদের এখনো অনেক পথ এগোনো বাকি। বিদ্যমান উদ্যোগগুলোর প্রশংসা করেই আমরা আরও বড় স্বপ্ন দেখতে পারি।

আর এখানেই কক্সবাজারের কথা মনে আসে—দেশের প্রধান সমুদ্রসৈকতভিত্তিক পর্যটনকেন্দ্র। সেখানে প্রতিনিয়ত নতুন হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও বহুতল ভবন গড়ে উঠছে। কিন্তু পর্যটকদের থাকার সুযোগ যতটা বাড়ছে, তাঁদের দেখার, শেখার ও নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ কি সেই অনুপাতে বাড়ছে?

কক্সবাজারে একটি বিশ্বমানের সামুদ্রিক অ্যাকুয়ারিয়াম বা ওশেনারিয়াম (Oceanarium) গড়ে উঠলে পর্যটনে যোগ হতে পারে নতুন মাত্রা। পাশাপাশি সামুদ্রিক জীববিজ্ঞান, পরিবেশ শিক্ষা, গবেষণা, প্রাণী সংরক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। দেশের সুনীল অর্থনীতির বিকাশেও এমন প্রকল্প ভূমিকা রাখতে পারে। কক্সবাজারে অবস্থিত বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের সঙ্গে সমন্বয় করলে এর গবেষণা ও শিক্ষার দিকটিও শক্তিশালী হবে।

আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে কিংবা বিদেশি বিনিয়োগে কক্সবাজারে এমন একটি বৃহৎ সামুদ্রিক অ্যাকুয়ারিয়াম ও গবেষণাকেন্দ্র গড়ে উঠবে, যেখানে দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা বঙ্গোপসাগরের জীববৈচিত্র্য দেখবেন, নতুন জ্ঞান অর্জন করবেন এবং প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শিখবেন।

তবে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্য শুধু বড় বিনিয়োগ নয়, বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা, প্রাণিকল্যাণ, উপযুক্ত আবাসস্থল, দক্ষ জনবল ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনাও অপরিহার্য।

বিদেশে গিয়ে আমরা অনেক সুন্দর স্থাপনা দেখি, প্রশংসা করি, ছবি তুলি। কিন্তু দেশে ফিরে সেই অভিজ্ঞতা কতটুকু কাজে লাগাতে পারি, সেটিও ভাবার বিষয়। সবাই হয়তো বড় বিনিয়োগ করতে পারবেন না, তবে নিজের অবস্থান থেকে ছোট কোনো ভালো উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।
এ ভাবনা থেকেই নিজের একটি সামান্য প্রচেষ্টার কথা বলতে চাই। বিদেশের অ্যাকুয়ারিয়াম দেখে যে স্বপ্নের জন্ম, তা শুধু কল্পনায় আটকে রাখিনি। সেই অনুপ্রেরণায় ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় আমার রেস্তোরাঁ ন্যাচার লাউঞ্জে ২১টি দৃষ্টিনন্দন মাছের অ্যাকুয়ারিয়াম স্থাপন করেছি।

আন্তর্জাতিক মানের অ্যাকুয়ারিয়াম কিংবা রেডিয়েন্ট ফিশ ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এর তুলনা চলে না। এটি সেই বড় স্বপ্নের ক্ষুদ্র একটি প্রতিফলন মাত্র।

আমার উদ্দেশ্য শুধু এটুকু—রেস্তোরাঁয় আসা পরিবারের সদস্যরা খাবারের পাশাপাশি মাছের সৌন্দর্যও উপভোগ করবেন, আর শিশুরা পাবে আনন্দ।

ন্যাচার লাউঞ্জে এসে আমি প্রায়ই শিশুদের আনন্দ-উচ্ছ্বাস গভীরভাবে লক্ষ করি। অ্যাকুয়ারিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের বিস্ময়ভরা চোখ আর প্রাণোচ্ছলতা আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় ২০১৫ সালের থাইল্যান্ডে। সেদিন আমার নিজের সন্তানরা যেমন আনন্দে মেতে উঠেছিল, আজ অন্য শিশুদের মধ্যেও সেই একই উচ্ছ্বাস দেখতে পাই। তাদের এই খুশিতে আমার মনও ভরে ওঠে এক অনাবিল তৃপ্তিতে।
আর এই সৌন্দর্য দেখে কোনো দর্শনার্থী যদি একবারও মনে মনে বলেন, ‘সুবহানাল্লাহ, আল্লাহর সৃষ্টি কত সুন্দর!’—তাহলে মনে করব, আমার এই ছোট্ট উদ্যোগ কিছুটা হলেও সার্থক হয়েছে।

বিদেশের অ্যাকুয়ারিয়ামে আল্লাহর সৃষ্টি দেখে মুগ্ধ হয়েছি, তাঁর শুকরিয়া আদায় করেছি, দেশের জন্য স্বপ্ন দেখেছি এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের ক্ষুদ্র চেষ্টা করেছি।

সৃষ্টির সৌন্দর্য চোখকে মুগ্ধ করে, আর সেই সৌন্দর্যে স্রষ্টার কুদরত উপলব্ধি অন্তরকে প্রশান্ত করে।

খুঁজুন