বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
মসজিদে ‘অনৈতিক কাজ’, মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর • লালমনিরহাটে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে এসআরবি'র বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা • ১২ বছরে ১৮ কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ, কর কর্মকর্তা সাইফুলকে ঘিরে প্রশ্ন • একাত্তরে পাক আর্মি থেকে হিংস্র ছিলো জামাত • পাবনা মেডিকেল প্রকল্পে ২৭ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ, তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন • গজারিয়ায় আরডিআরএস এর ৩১০ তম ভবেরচর শাখার উদ্বোধন • খাদ্য পরিদর্শক মাজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ • অস্ট্রেলিয়ান পার্লামেন্ট হাউসে উন্মোচিত হলো শরণার্থীদের নিজস্ব নীতি-রূপরেখা • ৩০০ টাকার সেই টিকিট ব্ল্যাকে বিক্রি হচ্ছে ১,০০০ টাকায়! • সঞ্জীব চৌধুরীর প্রতিকৃতি সরিয়ে ফেলেছে সিটি করপোরেশন
মতামত একাত্তরে পাক আর্মি থেকে হিংস্র ছিলো জামাত

একাত্তরে পাক আর্মি থেকে হিংস্র ছিলো জামাত

মার্কিন দার্শনিক ও সমাজতাত্ত্বিক এরিক হফার (Eric Hoffer) তাঁর বিখ্যাত আকর গ্রন্থ ‘দ্য ট্রু বিলিভার’ (The True Believer: Thoughts on the Nature of Mass Movements)-এ ধর্মীয় উগ্রতা, ধর্মান্ধতা এবং উগ্র গণ-আন্দোলনের পেছনের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণগুলো চমৎকারভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। 
হফারের মতে, ধর্মীয় বা রাজনৈতিক উগ্রতা কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শের শ্রেষ্ঠত্বের কারণে ছড়ায় না, বরং মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের কিছু নির্দিষ্ট সংকট থেকে এর উৎপত্তি হয়। তাঁর তত্ত্ব অনুযায়ী ধর্মীয় উগ্রতার প্রধান কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো: 
১. হতাশা এবং নিজের জীবনকে ব্যর্থ মনে করা (Frustration and Self-Loathing)
হফারের মূল প্রতিপাদ্য হলো, যারা চরমভাবে হতাশ এবং নিজেদের জীবনকে অর্থহীন, ব্যর্থ বা নষ্ট মনে করে, তারাই উগ্রবাদের দিকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকে পড়ে। এই ধরনের মানুষ নিজেদের বর্তমান অবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারে না এবং নিজেদের ব্যর্থতার গ্লানি থেকে মুক্তি পেতে চায়। ধর্মীয় উগ্র আন্দোলন তাদের এই ব্যর্থতাবোধ ঢাকার একটি বড় হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়। 
২. আত্মত্যাগ ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বিসর্জনের আকাঙ্ক্ষা (Escape from the Self)
ধর্মান্ধ মানুষ নিজের ব্যক্তিগত পরিচয় বা 'আমিত্ব' থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায়। হফার উল্লেখ করেছেন যে, উগ্র আন্দোলনের মূল আকর্ষণ নিজের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা নয়, বরং নিজের সত্তাকে সম্পূর্ণ বিলীন করে দেওয়া। একটি বড় ধর্মীয় গোষ্ঠীর সাথে নিজেকে যুক্ত করে তারা ব্যক্তিগত হীনমন্যতা ভুলে একটি 'মহৎ উদ্দেশ্যে' আত্মত্যাগের মাঝে এক ধরনের মিথ্যা গৌরব খুঁজে পায়। 
৩. আত্মবিশ্বাসের অভাব ও ধর্মীয় মোহের আশ্রয় (Substitution of Self-Faith)
হফার একটি বিখ্যাত উক্তিতে বলেছেন—"একটি পবিত্র আদর্শের প্রতি অন্ধ বিশ্বাস মূলত আমাদের নিজেদের ওপর হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাসের একটি বিকল্প মাত্র।" অর্থাৎ, যাদের নিজের যোগ্যতা ও ভবিষ্যতের ওপর আস্থা থাকে না, তারা কোনো এক অমোঘ ধর্মীয় মতবাদ বা কোনো অলৌকিক নেতার অন্ধ অনুসারী হয়ে অবিনশ্বর শক্তির অংশ হতে চায়।
৪. পরিচয়হীনতা ও একাকীত্ব (Alienation and Search for Belonging)
সমাজে যারা একাকী, প্রান্তিক বা মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন (যেমন: সংখ্যালঘু বা খাপ খাওয়াতে না পারা মানুষ), তাদের উগ্রবাদীরা সহজেই প্রলোভিত করতে পারে। উগ্র গোষ্ঠীগুলো তাদের একাকীত্ব দূর করে একটি শক্তিশালী যৌথ পরিচয় এবং একাত্মতার অনুভূতি দেয়, যা তাদের মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তা জোগায়। 
৫. পরম সত্যের অন্ধ অনুসন্ধান (The Desire for Absolute Certainty)
ধর্মান্ধরা কোনো সংশয় বা জটিলতা পছন্দ করে না। তারা জীবন ও জগতের সরল এবং পরম ব্যাখ্যা খোঁজে। উগ্র ধর্মীয় আন্দোলনগুলো তাদের চরম নিশ্চয়তা দেয় যে—"তারাই কেবল সত্য এবং বাকিরা সবাই ভুল বা শত্রু"। এই ধরনের আপসহীন মানসিকতা মানুষকে উগ্র ও সহিংস করে তোলে।
৬. কাল্পনিক শত্রু তৈরি ও ঘৃণা (The Need for a Holy Enemy)
হফারের মতে, যেকোনো উগ্র আন্দোলনকে টিকিয়ে রাখতে এবং অনুসারীদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে একটি 'পবিত্র শত্রু' বা অভিন্ন প্রতিপক্ষের প্রয়োজন হয়। উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো অন্য কোনো ধর্ম, সম্প্রদায় বা ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিকতাকে নিজেদের অস্তিত্বের শত্রু হিসেবে দাঁড় করায়। এই কৃত্রিম ঘৃণা অনুসারীদের ভেতরে অন্ধ উন্মাদনা তৈরি করে। 
সংক্ষেপে বলতে গেলে, হফারের দৃষ্টিতে ধর্মীয় উগ্রতা কোনো আধ্যাত্মিক বিষয় নয়, বরং এটি হলো মানুষের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা ও হতাশা থেকে বাঁচতে নিজের পরিচয়কে একটি বৃহত্তর চরমপন্থী গোষ্ঠীর মধ্যে সঁপে দেওয়ার মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা।।

খুঁজুন